রাশিয়া ও ইউক্রেনের সামরিক সংঘর্ষের পরিপ্রেক্ষিতে রাশিয়া সরকার ২০২৫ সালের শেষের দিকে বেশ কয়েকটি শহরের দখল দাবি করেছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন গত শুক্রবারের সংবাদ সম্মেলনে সিভের্স্ক (ডোনেটসক) ও ভোভচান্স্ক (খারকিভ) শহরের নিয়ন্ত্রণের কথা উল্লেখ করেন। এছাড়া তিনি লায়মান ও কোস্টিয়ান্টিনিভকা (ডোনেটসক) এবং হুল্যাইপোল (জাপোরিজিয়া) শহরের অর্ধেকের বেশি অংশ রাশিয়ার হাতে রয়েছে বলে দাবি করেন।
ইউক্রেনের স্বাধীনতা পর্যবেক্ষক ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংক ট্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার (ISW) এই দাবিগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে। উপগ্রহ চিত্র ও উন্মুক্ত সূত্রের ভিত্তিতে ISW উল্লেখ করে যে হুল্যাইপোলের মাত্র ৭.৩ শতাংশ এবং লায়মানের ২.৯ শতাংশে রাশিয়ার উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। কোস্টিয়ান্টিনিভকায় রাশিয়ার দখল ৫ শতাংশের বেশি না হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মিলব্লগারদের (সামরিক বিশ্লেষক) তথ্যও পুতিনের দাবির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তারা জানায় যে রাশিয়ান বাহিনী লায়মানের সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ এবং কোস্টিয়ান্টিনিভকায় ১১ শতাংশ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে। এই সংখ্যা পুতিনের উল্লেখিত অর্ধেকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
ক্রেমলিনের আরেকটি দাবি হল খারকিভের কুপিয়ান্স্ক ও ডোনেটসকের পোক্রোভস্ক শহরের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। ISW এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী রাশিয়া বর্তমানে খারকিভের কেবল ৭.২ শতাংশই দখল করতে পারেছে। ইউক্রেনের প্রধান কমান্ডারও পোক্রোভস্কে রাশিয়ান দখলকে ১৬ বর্গকিলোমিটার (৬.১ বর্গমাইল) পর্যন্ত সীমাবদ্ধ বলে জানিয়েছেন।
ডিসেম্বর ১৮ তারিখে রাশিয়ার জেনারেল ভ্যালেরি গেরাসিমভ বিদেশি সামরিক কর্মকর্তাদের সামনে বছরের শেষের প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। তিনি রাশিয়ার সামরিক বাহিনী এই বছর ৬,৩০০ বর্গকিলোমিটার (২,৪৩২ বর্গমাইল) ইউক্রেনের ভূখণ্ড দখল করেছে বলে দাবি করেন। এটি রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আন্দ্রেই বেলৌসনভের এক সপ্তাহ আগে করা ৬,০০০ বর্গকিলোমিটার (২,৩০০ বর্গমাইল) দাবির চেয়ে সামান্য বেশি।
ISW গেরাসিমভের এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং রাশিয়ার প্রকৃত দখলকৃত এলাকা উল্লেখযোগ্যভাবে কম বলে অনুমান করে। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন যে রাশিয়ার এই ধরনের পরিসংখ্যান প্রকাশের পেছনে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রভাব ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনার সময়সীমা বাড়ানোর উদ্দেশ্য থাকতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা রাশিয়ার দাবিগুলোকে সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছেন। তারা রাশিয়ার দখলকৃত ভূখণ্ডের সঠিক পরিমাপ নির্ধারণে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও উপগ্রহ তথ্যের ওপর নির্ভর করতে বলছেন। একই সঙ্গে, রাশিয়ার দাবি ইউক্রেনের ভূখণ্ডীয় অখণ্ডতা নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনার তীব্রতা বাড়িয়ে তুলতে পারে।
ইউক্রেনের সরকার রাশিয়ার দাবিগুলোকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছে এবং তাদের সামরিক বাহিনীর অগ্রগতি রোধে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে। ইউক্রেনের সামরিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন যে রাশিয়ার সাময়িক অগ্রগতি কোনো কৌশলগত পরিবর্তন ঘটায়নি এবং লাইনগুলো এখনও পরিবর্তনশীল।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা রাশিয়ার এই ধরনের পরিসংখ্যান প্রকাশকে যুদ্ধের মানসিক যুদ্ধের অংশ হিসেবে দেখছেন। তারা বলেন, রাশিয়া আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে এবং অভ্যন্তরীণ জনমতকে সমর্থন দিতে এমন দাবি ব্যবহার করে।
ইউক্রেনের পশ্চিমা মিত্র দেশগুলো রাশিয়ার দাবিগুলোর বিপরীতে ইউক্রেনের ভূখণ্ডীয় অখণ্ডতা রক্ষার জন্য অতিরিক্ত সামরিক ও আর্থিক সহায়তা প্রদান অব্যাহত রাখবে। ন্যাটো সদস্য দেশগুলো রাশিয়ার দাবির ভিত্তিতে কোনো নতুন সীমানা স্বীকৃতি দেবে না বলে স্পষ্ট করেছে।
এই পরিস্থিতিতে পরবর্তী মাইলস্টোন হিসেবে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান শান্তি আলোচনার ফলাফল এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপগ্রহ তথ্যের বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। রাশিয়ার দাবিগুলো কতটা বাস্তবিক ভিত্তি পাবে তা নির্ধারণে পরবর্তী সপ্তাহের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ মূল চাবিকাঠি হবে।
সারসংক্ষেপে, রাশিয়া ২০২৫ সালে ইউক্রেনের বিশাল এলাকা দখল করার দাবি করেছে, তবে স্বাধীন বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই দাবিগুলোকে সীমিত বাস্তবতা হিসেবে দেখছেন। রাশিয়ার এই দাবিগুলো দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রভাব ফেলতে পারে, তবে বাস্তব দখলকৃত এলাকা ও সামরিক অগ্রগতির সঠিক পরিমাপ এখনও অনিশ্চিত।



