বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনা ১৬ মাসের বেশি সময় ধরে বাড়ছে, এবং গত দশ দিনেই তা গভীর সংকটে পরিণত হয়েছে। দুই দেশের কূটনৈতিক কর্মীরা পাল্টা বিবৃতি দিয়ে একে অপরের নীতি সমালোচনা করছেন, আর দিল্লি, কলকাতা, মুম্বাই ও আগরতলায় হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীসমূহ বাংলাদেশ মিশনের দিকে প্রতিবাদ রেলেছেন। এই প্রতিবাদে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটেছে, ফলে নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়ে।
সেই নিরাপত্তা উদ্বেগের প্রতিক্রিয়ায় ভারতীয় সরকার দিল্লি সহ অন্তত চারটি শহরে বাংলাদেশ ভিসা সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে। একই সময়ে ঢাকা সরকারও ভারতীয় ভিসা সেবা চারটি স্থানে, যার মধ্যে রাজধানী ঢাকা অন্তর্ভুক্ত, বন্ধ করেছে। এই পদক্ষেপগুলো দু’দেশের নাগরিক চলাচলে বাধা সৃষ্টি করেছে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতি আরও ত্বরান্বিত করেছে।
এই উত্তেজনার পটভূমি হল ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের জাতীয় গণঅভ্যুত্থান, যার ফলে দীর্ঘমেয়াদী শাসনকারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার পতিত হয় এবং তিনি ভারতের আশ্রয় নেন। তার পরপরই একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হয়, যা দুই দেশের মধ্যে তিক্ততা বাড়িয়ে দেয়। যদিও গত ডিসেম্বরেও দু’দেশের মধ্যে টানাপোড়েন দেখা গিয়েছিল, তবে তা বর্তমানের মতো তীব্রতা পায়নি। সেই সময়ে দু’দেশের পররাষ্ট্র সচিবেরা ঢাকায় বৈঠক করে, এবং একই সঙ্গে ভারতের বিভিন্ন শহরে বাংলাদেশ মিশনের দিকে প্রতিবাদ রেলেছিল।
ডিসেম্বরের শেষের দিকে পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে, বিশেষ করে ১১ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ফলাফল ঘোষণার পর। নির্বাচনের ফলাফলকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনা দেখা দেয়, যা ভিসা সেবা বন্ধের মতো কঠোর পদক্ষেপের দিকে নিয়ে যায়।
হিন্দুত্ববাদী সংগঠন, বিশেষ করে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (VHP) এবং তার সঙ্গে যুক্ত গোষ্ঠীগুলো, গত বছরের আগস্ট থেকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ উত্থাপন করে। তারা এই বিষয়টি আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় তুলে ধরতে চায়, এবং ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমও এই দাবিগুলোকে সমর্থন করে। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই দাবিগুলোকে যথেষ্ট প্রমাণবিহীন বলে বিবেচনা করে, এবং বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের প্রকৃত মাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
শেখ হাসিনা ও তার আওয়ামী লীগ, যেটি বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ, ভারতের সমর্থন পেয়েছে বলে দাবি করা হলেও, তা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের মূল বিষয় নয়। ভারতীয় হিন্দু গোষ্ঠীর নেতারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়ভাবে তাদের মতামত প্রকাশ করে, এবং একই সঙ্গে শেখ হাসিনারও সামাজিক মাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পায়। এই পরিস্থিতিতে ভারতীয় মিডিয়া তাকে নিয়মিত সাক্ষাৎকার দেয়, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জটিলতা বাড়িয়ে দেয়।
দুই দেশের কূটনৈতিক মঞ্চে এখন পর্যন্ত স্পষ্ট যে, ভিসা সেবা বন্ধের পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, প্রতিবাদ দমিয়ে রাখা এবং কূটনৈতিক চ্যানেল দিয়ে সমঝোতা করার প্রচেষ্টা চলছে। তবে উভয় পক্ষের রাষ্ট্রীয় ও অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীর পারস্পরিক বিরোধের কারণে সমঝোতা সহজে অর্জিত হচ্ছে না।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন যে, যদি বর্তমান উত্তেজনা অব্যাহত থাকে, তবে বাণিজ্যিক ও মানবিক বিনিময় কমে যাবে, যা উভয় দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এছাড়া, সীমান্তে নিরাপত্তা পরিস্থিতি অবনতি পেলে সশস্ত্র সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই, পরবর্তী ধাপে দু’দেশের শীর্ষ কূটনীতিকদের সরাসরি সাক্ষাৎ এবং পারস্পরিক উদ্বেগের সমাধানের জন্য বিশেষ দায়িত্বশীল দল গঠন করা প্রয়োজন।
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে উভয় দেশের রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি, নিরাপত্তা উদ্বেগের সমাধান এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যস্থতার উপর। বর্তমান সংকটের সমাধান না হলে, দীর্ঘমেয়াদে দু’দেশের কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের ওপর গভীর প্রভাব পড়তে পারে।



