ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইয়োয়াভ গ্যালান্টের সাম্প্রতিক বক্তব্যে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও লেবানন, সিরিয়া, গাজা এবং ইয়েমেনের চারটি অঞ্চলে ইসরায়েলি সামরিক কার্যক্রম পূর্ণ তীব্রতায় চালু থাকবে। গ্যালান্ট এই মন্তব্য ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর পাইলট প্রশিক্ষণ কোর্সের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রদান করেন, যেখানে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সেনাপ্রধান হারজি হালেভি উপস্থিত ছিলেন।
মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আঞ্চলিক সংস্থাগুলি বিভিন্ন কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের পরও, ইসরায়েলি সরকার এই চারটি ফ্রন্টে তার সামরিক নীতি পরিবর্তন না করার দৃঢ় সংকল্প প্রকাশ করেছে। গ্যালান্টের মতে, প্রতিটি ফ্রন্টের জন্য পৃথক কৌশলগত লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে এবং সেগুলোতে কোনো ধীরগতি বা প্রত্যাহার করা হবে না।
লেবাননে, গ্যালান্ট হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ সামরিক শক্তি প্রয়োগ অব্যাহত রাখার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, হিজবুল্লাহর সীমানা অতিক্রমের কোনো সুযোগ না দিয়ে, ইসরায়েলি সশস্ত্র বাহিনী লেবাননের সীমান্তে সতর্কতা বজায় রাখবে। সিরিয়ার ক্ষেত্রে, গ্যালান্ট জাবাল আল-শেইখ (মাউন্ট হারমোন) এবং নিরাপত্তা অঞ্চলে ইসরায়েলি অবস্থান থেকে সরে না যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন, যা পূর্বে গৃহযুদ্ধের পর থেকে ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে থাকা উচ্চভূমি অঞ্চল।
গাজা উপত্যকায়, গ্যালান্ট হামাসকে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা এবং অঞ্চলকে নিরস্ত্রীকরণের প্রতিশ্রুতি পুনরায় নিশ্চিত করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, গাজার নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি বিমান ও স্থলবাহিনীর কার্যক্রম চালু থাকবে। একই সঙ্গে, ইয়েমেনে হুথি গোষ্ঠীর সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে বাধা দেওয়ার জন্য ইসরায়েলি অভিযান চালিয়ে যাবে, যা ইরানের প্রভাবকে সীমাবদ্ধ করার বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচিত।
ইরান সংক্রান্ত বিষয়ে গ্যালান্টের মন্তব্য বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচালিত এক আক্রমণে ইরানের পারমাণবিক ও কৌশলগত সক্ষমতায় “অপূরণীয় ক্ষতি” ঘটানো হয়েছে বলে দাবি করেন। তবে, নিরাপত্তা সংস্থার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই আক্রমণের বিশদ তথ্য বর্তমানে গোপন রাখা হয়েছে। ইরান বা আন্তর্জাতিক পারমাণবিক এজেন্সি (IAEA) থেকে এই দাবির কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এখনো প্রকাশিত হয়নি।
গাজা উপত্যকায় ২০২৩ সালের অক্টোবর মাস থেকে চলমান ইসরায়েলি অভিযান পর্যন্ত মোট ৭১,০০০েরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে, যার বেশিরভাগই নারী ও শিশু। এই মানবিক ক্ষতি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং সংঘাতের সমাধানে কূটনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন যে, ইসরায়েলের এই কঠোর অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে। এক আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞের মতে, ইসরায়েল যদি একাধিক ফ্রন্টে সামরিক সম্পদ সমানভাবে বিতরণ করে, তবে তা তার কৌশলগত স্থিতিশীলতা ও গৃহযুদ্ধের পরিণতি উভয়ই প্রভাবিত করতে পারে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ইসরায়েলের আক্রমণাত্মক নীতি বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে অনুমান করা হয়।
অতএব, পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ বাড়তে পারে, বিশেষ করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ইসরায়েলি কার্যক্রমের ওপর আলোচনা এবং মানবিক সহায়তা প্রদান সংক্রান্ত রেজলিউশন প্রণয়নের সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর থেকে ইসরায়েলকে কূটনৈতিকভাবে সমঝোতার পথে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান বাড়বে বলে বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন।
সারসংক্ষেপে, ইসরায়েলি সরকার লেবানন, সিরিয়া, গাজা এবং ইয়েমেনের চারটি ফ্রন্টে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প প্রকাশ করেছে, যদিও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এই অবস্থান ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা, হিজবুল্লাহ ও হুথি গোষ্ঠীর কার্যক্রম এবং গাজার মানবিক সংকটের সঙ্গে যুক্ত, যা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিবেশকে জটিল করে তুলছে। ভবিষ্যতে কূটনৈতিক আলোচনার ফলাফল এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া এই সংঘাতের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



