ডিসেম্বর ১৮ রাত ৯:৩০ টার দিকে ঢাকা শহরের কেন্দ্রীয় ব্যবসা এলাকার দু’টি প্রধান সংবাদপত্রের কার্যালয়ে মব আক্রমণকারীরা প্রবেশ করে অগ্নিকাণ্ড ঘটায়। দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো দু’টি সংস্থার অফিসে আগুন জ্বলে, ফলে সাংবাদিক ও কর্মচারীরা ধোঁয়ার মধ্যে ছাদে পলায়ন করতে বাধ্য হয়।
আক্রমণকারীরা দরজার কাছে উপস্থিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জানালার ভাঙা, দরজা ভাঙা এবং দ্রুত অগ্নি ছড়ানোর কাজ করে। অগ্নিকাণ্ডের ফলে ধোঁয়া ঘন হয়ে গিয়ে কর্মস্থলের ভিতরে শ্বাসপ্রশ্বাস কঠিন করে দেয়, ফলে উপস্থিত ৩৫ বছর বয়সী সাংবাদিক জাইমা ইসলাম ও তার ২৮ সহকর্মী ছাদে উঠে নিরাপত্তা খোঁজে।
এই হিংসাত্মক ঘটনার পেছনে শ্রীলঙ্কা-ভিত্তিক গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের নেতা শারিফ ওসমান বিন হাদি’র হত্যার প্রতিক্রিয়া হিসেবে মবের ক্রোধের উত্স রয়েছে। ১৮ ডিসেম্বর রাতে হাদি’র মৃত্যুর খবর শোনার সঙ্গে সঙ্গে তার সমর্থকরা সরকারকে দায়ী করে, এবং হাদি’র হত্যাকারীদেরকে শেখ হাসিনার সমর্থক বলে অভিযোগ করে। কর্তৃপক্ষের মতে, সংশ্লিষ্ট অপরাধীরা ভারতীয় সীমান্তে পলায়ন করেছে।
শেখ হাসিনার শাসনামলে মিডিয়া ও মানবাধিকার সংস্থার ওপর ধারাবাহিক নিপীড়ন সত্ত্বেও দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। গত বছরই একই ধরনের আক্রমণে উভয় পত্রিকার অফিসে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল, তবে এইবারের আক্রমণ আরও বিশাল এবং প্রাণঘাতী রূপ নিয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের সময় ধোঁয়া এতটাই ঘন হয়ে গিয়েছিল যে হাতে থাকা মোবাইল ফোনের স্ক্রিনও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল না। পরিস্থিতি তীব্র হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে জাইমা ইসলাম ফেসবুকে একটি বার্তা পোস্ট করেন, যেখানে তিনি লিখেছেন যে তিনি আর শ্বাস নিতে পারবে না এবং এটি তার শেষ পোস্ট হতে পারে। তার পোস্টটি তৎকালীন ঘটনাস্থলে উপস্থিতদের মধ্যে আতঙ্কের সঞ্চার করে।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মব আক্রমণের শিকার হয়ে মোট ১৮৪ জন নিহত হয়েছে, যা গত বছরের ৫১ মৃত্যুর তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। একই সপ্তাহে ধর্মীয় অবমাননার গুজবে একটি হিন্দু পোশাকশ্রমিককে টেনে বের করে পিটিয়ে হত্যা করা হয়, যা দেশের ধর্মীয় সংবেদনশীলতাকে আরও উত্তেজিত করেছে।
শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের সমাপ্তি থেকে মাত্র ১৫ মাস কেটে যাওয়ার পর, দেশের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নিয়ে সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী সমাজে গভীর উদ্বেগ দেখা দিচ্ছে। আগস্ট ২০২৪-এ গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়, তবে তার পরবর্তী সময়ে মবের ক্রমবর্ধমান হিংসা এবং মিডিয়া আক্রমণ দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন যে এই ধরনের হিংসা ও অস্থিরতা আসন্ন নির্বাচনী চক্রে প্রভাব ফেলতে পারে। মবের লক্ষ্যবস্তু হয়ে থাকা মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলো যদি স্বাভাবিকভাবে কাজ চালিয়ে না পারে, তবে তথ্যের স্বচ্ছতা ও জনমত গঠনে বাধা সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে, মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্টে উল্লেখিত মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গি কঠোর হতে পারে।
অবশেষে, ঢাকা শহরে এই অগ্নিকাণ্ড ও মব আক্রমণ দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন এক উত্তেজনা যোগ করেছে। সরকারকে এখন নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে, অপরাধী গোষ্ঠীর দায়িত্ব নিশ্চিত করতে এবং মিডিয়ার স্বাধীনতা রক্ষার জন্য ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে হবে। ভবিষ্যতে যদি হিংসা নিয়ন্ত্রণে না আসে, তবে দেশের গণতান্ত্রিক উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সুনাম উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।



