সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সীগঞ্জ ইউনিয়নের পশ্চিম ধানখালী গ্রামে বসবাসকারী পার্বতী মণ্ডল, নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী, প্রতিদিনের কাজের অংশ হিসেবে পানির কলসী হাতে নিয়ে বাড়ি থেকে প্রায় ২০‑২৫ মিনিট হাঁটতে হয়। তার প্রধান কাজ হল পরিবারের জন্য খাওয়ার পানি সংগ্রহ করা, যা তাকে সপ্তাহের বেশিরভাগ দিন স্কুলে উপস্থিতি থেকে দূরে রাখে। ফলে, পার্বতী সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন পর্যন্ত ক্লাসে না গিয়ে থাকে, যদিও তার বয়স ও স্তরে শিক্ষার অধিকার রয়েছে।
পার্বতীর পরিবারে বাবা ঠাকুরদাস মণ্ডল ও মা সুখদেবী মণ্ডল দিনমজুরের কাজ করেন; দুই বোন ও এক ভাইয়ের সঙ্গে গৃহস্থালির দায়িত্ব ভাগ করে নেয়। বড় বোনের বিবাহ হয়ে গেছে, আর ভাই চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। গৃহের আর্থিক অবস্থা সীমিত হওয়ায়, পানির সংগ্রহের দায়িত্ব প্রায় সম্পূর্ণভাবে পার্বতীর কাঁধে নেমে আসে। তার মা একা সব কাজ সামলাতে পারছেন না, তাই পার্বতীকে ঘরের কাজের পাশাপাশি পানির জন্য দূর পর্যন্ত হাঁটতে হয়।
শুক্রবার ২৬ এপ্রিল ২০২৩ তারিখে স্থানীয় বাসিন্দারা তীব্র পানির ঘাটতির কথা জানিয়েছেন। পার্বতী নিজে জানান যে, পানির জন্য সময় ব্যয় করার ফলে তার পড়াশোনার ক্ষতি হয় এবং অনুপস্থিতির দিনগুলোতে সে বন্ধুদের কাছ থেকে নোট নেয়। একই সমস্যার সম্মুখীন কিশোরী শিক্ষার্থীরা শ্যামনগর ও বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে রয়েছে। তাদের বাবা-মা ও শিক্ষকগণও এই অবস্থা নিশ্চিত করেছেন।
বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের আড়পাংগাশিয়া গ্রামে অবস্থিত প্রিয়নাথ মাধ্যমিক স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দেবাশীষ জোয়ার্দার জানান, এই এলাকায় পানির অভাব দীর্ঘদিনের সমস্যা এবং সব পরিবারই টাকা দিয়ে পানি কিনতে পারে না। ফলে, শিশুরা দূর থেকে পানি আনতে হয়, যা তাদের শিক্ষার ধারাকে বাধাগ্রস্ত করে। জোয়ার্দার উল্লেখ করেন, পানির সমস্যার সমাধান না হলে স্কুলে উপস্থিতি বাড়ানো কঠিন হবে।
স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থা ও গৃহস্থালির আর্থিক চাপের মেলবন্ধনই কিশোরী শিক্ষার্থীদের শিক্ষায় বাধা সৃষ্টি করছে। পার্বতীর মতো বহু কিশোরী প্রতিদিনের জীবনের মৌলিক চাহিদা পূরণে সময় ব্যয় করে, ফলে তাদের শিক্ষাগত অগ্রগতি ধীর হয়ে যায়। এই পরিস্থিতি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত নয়, সমগ্র এলাকার মানবসম্পদ বিকাশের জন্যও হুমকি স্বরূপ।
পানির সমস্যার সমাধান না হলে শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হবে। স্থানীয় স্বশাসন ও এনজিওগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে পানির সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে শিশুরা দূরত্ব অতিক্রম না করে পানির প্রয়োজন মেটাতে পারে। এছাড়া, গৃহস্থালির কাজের ভার সমানভাবে ভাগ করে নেওয়া, বিশেষ করে পুরুষ সদস্যদের অংশগ্রহণ বাড়ানোও শিক্ষার ধারাকে সুরক্ষিত করতে সহায়ক হবে।
পাঠকদের জন্য ব্যবহারিক টিপস: যদি আপনার এলাকায় পানির ঘাটতি থাকে, তবে সমবায়ভাবে বোরহোল বা রেনোভার্ট সিস্টেমের মতো টেকসই সমাধান অনুসন্ধান করুন। এছাড়া, স্থানীয় সরকারকে পানি শোধন ও বিতরণে সহায়তা করার জন্য আবেদন করুন এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বিকল্প শিক্ষার সময়সূচি বা অনলাইন সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বিবেচনা করুন।



