২৫ ডিসেম্বর, তাইওয়ান দ্বীপে সংবিধান দিবস হিসেবে পালিত হয়; এই দিনটি ১৯৪৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর গৃহীত সংবিধানকে স্মরণ করে, যা দেশের আধুনিক গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করেছে। তৎকালীন চীন ও তাইওয়ান যুদ্ধের পরবর্তী অস্থির সময়ে লিখিত সংবিধানের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়, ফলে নানজিংয়ে জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে দীর্ঘ আলোচনার পর এই নথি অনুমোদিত হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি এবং চীনের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক অশান্তি, তাইওয়ানের জন্য একটি স্পষ্ট আইনি কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে দেয়। সংবিধানটি সামরিক শাসন বা একনায়কতন্ত্রের পরিবর্তে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি বহন করে, যা দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশকে নতুন রূপ দেয়। যদিও পরবর্তী কয়েক দশক ধরে তাইওয়ানে সামরিক আইন কার্যকর ছিল, তবু ১৯৪৬ সালের সংবিধানই গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখানো নাগরিকদের জন্য আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করেছে।
১৯৮০-এর দশকের শেষভাগে গণতান্ত্রিক আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে, এবং জনগণ সংবিধানের পূর্ণ বাস্তবায়নকে তাদের প্রধান দাবি হিসেবে উপস্থাপন করে। এই সময়ে সংবিধানকে কেবল কাগজের শিরোনাম নয়, বাস্তবিক শাসনব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ফলস্বরূপ, আজকের আধুনিক, সমৃদ্ধ এবং বহুমুখী তাইওয়ানের রাজনৈতিক কাঠামো মূলত ২৫ ডিসেম্বর গৃহীত সংবিধানের নীতির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।
প্রেসিডেনশিয়াল অফিস বিল্ডিং এবং জিয়েগাও চত্বরে এই দিনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়, যা দেশের সংবিধানিক ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে। যদিও সংবিধান দিবস আর সরকারি ছুটি নয়, তবু রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর গুরুত্ব অপরিসীম রয়ে গেছে; সরকারী অনুষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠী এই দিনটি স্মরণ করে।
বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে গৃহীত সংবিধানের সঙ্গে তাইওয়ানের ২৫ ডিসেম্বরের সংবিধান দিবসের একটি সমান্তরাল দেখা যায়। উভয় দেশের জন্য সংবিধান কেবল ভূখণ্ডের দখল নয়, বরং নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও আইনের শাসন নিশ্চিত করার প্রতীক। এই তুলনা দুই দেশের জনগণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে—সত্যিকারের জাতীয় বিজয় হল গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা।
তবে সংবিধান দিবসের সমর্থক এবং সমালোচকদের মধ্যে মতবিরোধও বিদ্যমান। কিছু বিশ্লেষক যুক্তি দেন যে, আধুনিক তাইওয়ানে সংবিধানিক কাঠামোতে এখনও কিছু দুর্বলতা রয়ে গেছে, যেমন নির্বাচনী ব্যবস্থা ও মানবাধিকার সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে সংস্কারের প্রয়োজন। তারা এই দিনটিকে একটি পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ হিসেবে দেখেন, যাতে ভবিষ্যৎ সংস্কারকে ত্বরান্বিত করা যায়।
ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সংবিধান দিবসের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। আসন্ন নির্বাচনে বিভিন্ন দল সংবিধানের সংস্কার ও তার কার্যকর বাস্তবায়নকে মূল প্রতিশ্রুতি হিসেবে তুলে ধরছে, যা নাগরিকদের মধ্যে সংবিধানিক সচেতনতা বাড়াবে। এছাড়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সংবিধান দিবসের অনুষ্ঠানগুলোকে পাঠ্যক্রমের অংশ করে তুললে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আইনের শাসনের প্রতি সম্মান ও বোঝাপড়া গভীর হবে।
সারসংক্ষেপে, ২৫ ডিসেম্বরের সংবিধান দিবস তাইওয়ানের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, যা যুদ্ধপরবর্তী অস্থিরতা থেকে গণতন্ত্রের পথে অগ্রসর হওয়ার সংকেত দেয়। এই দিনটি কেবল অতীতের স্মরণ নয়, বরং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক আলোচনার একটি ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। তাইওয়ান ও বাংলাদেশের সংবিধানিক যাত্রা একে অপরকে প্রতিফলিত করে, যেখানে আইনের শাসন ও নাগরিক অধিকারকে সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করা হয়। সংবিধান দিবসের মাধ্যমে দেশটি তার গণতান্ত্রিক আদর্শকে পুনর্ব্যক্ত করে, এবং এই ঐতিহ্যকে রক্ষা ও উন্নয়নের জন্য ধারাবাহিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে।



