নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায় চর দখলের জন্য গৃহীত হিংসাত্মক সংঘর্ষে পাঁচজনের মৃত্যু এবং দশজনের আঘাতের ঘটনা ঘটেছে। ২৩ বছর বয়সী সুবর্ণচর উপজেলার সৈকত সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মোবারক হোসেন সিহাব, তার বাবার শামছুদ্দিনকে ফিরিয়ে আনতে গিয়ে প্রাণ হারায়। ঘটনাস্থল হল হাতিয়া উপজেলার সুখচর ও জাগলার চরের পার্শ্ববর্তী এলাকা, যেখানে শামছু ও আলাউদ্দিন বাহিনীর মধ্যে গুলি চালনা হয়।
সিহাবের পরিবার দাবি করে যে, তার বাবা মো. শামছুদ্দিন, যাকে স্থানীয়ভাবে ‘কোপা শামছু’ বাহিনীর প্রধান বলা হয়, চরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ভূমিহীন করে বসানোর হুমকি দেওয়া হয়। শামছু বাহিনীর স্ত্রী মাহফুজা বেগম জানান, “কিছু লোক আমার স্বামীকে প্রলোভন দেখিয়ে চরে নিয়ে যায়, কিন্তু তিনি ফিরে আসেন না। আমার ছেলে শিহাব বাবাকে ফিরিয়ে আনতে গিয়ে মারা গেছেন।” এই বিবরণে তিনি সিহাবের মৃত্যুর কারণকে চরে গিয়ে ঘটিত গুলিবর্ষণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
মঙ্গলবার ভোরে সুখচর ইউনিয়নের জাগলার চরে শামছু ও আলাউদ্দিন বাহিনীর মধ্যে গুলি চালনা শুরু হয়। দুই দলের মধ্যে তীব্র গোলাবারুদ বিনিময়ের ফলে অন্তত পাঁচজনের মৃত্যু হয়। মৃতদের মধ্যে ছিলেন হাতিয়ার সুখচর ইউনিয়নের আমানউল্যাহ গ্রামের মহিউদ্দিনের ছেলে মো. আলাউদ্দিন (৩৫), চানন্দী ইউনিয়নের নলের চরের সেকু মিয়ার ছেলে কামাল উদ্দিন (৪০), জাহাজমারা ইউনিয়নের মোবারক হোসেন সিহাব (২৩), হাতিয়া পৌরসভার পশ্চিম লক্ষিদিয়া এলাকার শাহ আলমের ছেলে হকসাব (৫৫) এবং সুবর্ণচর উপজেলার দক্ষিণ চর মজিদের জয়নাল আবেদিনের ছেলে আবুল কাশেম (৬২)।
আলাউদ্দিনকে তার নামে পরিচিত বাহিনীর প্রধান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, আর মোবারক হোসেন সিহাব শামছু বাহিনীর প্রধান শামছুদ্দিনের পুত্র। গুলিবর্ষণের সময় দুই বাহিনীর সদস্যসহ অন্যান্য লোকজনও আহত হয়। আহতদের মধ্যে একটি ৩০ বছর বয়সী মো. সোহাবকে উদ্ধার করে হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। অন্য এক আহত, নিঝুম দ্বীপের সাত নম্বর ওয়ার্ডের খবির উদ্দিনের ছেলে, সোহাহের অবস্থা গুরুতর বলে জানানো হয়েছে।
নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী বুধবার দুপুরে জানান, কামাল উদ্দিন, মোবারক হোসেন, হকসাব ও আবুল কাশেমের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে এবং তাদের দেহ হাসপাতালের নির্ধারিত বিভাগে প্রেরণ করা হয়েছে। আহতদের চিকিৎসা চলমান, তবে তাদের অবস্থার বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
পুলিশের মতে, চরের দখল ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দল দীর্ঘ সময়ের বিরোধে লিপ্ত। ঘটনাস্থলে গুলি চালনার পরপরই নিরাপত্তা বাহিনীর হস্তক্ষেপে গুলিবর্ষণ থেমে যায়, তবে ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো শোকাহত। স্থানীয় প্রশাসন ঘটনাস্থলকে নিরাপদ করতে অতিরিক্ত পুলিশ ও রক্ষী বাহিনীর মোতায়েনের পরিকল্পনা করেছে।
বিবাদিত চরের দখল নিয়ে চলমান তদন্তে পুলিশ সকল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম ও পরিচয় সংগ্রহ করছে। শামছু বাহিনীর শীর্ষ সদস্য শামছুদ্দিনের অবস্থান এখনো অজানা, এবং তার পরিবারের সদস্যরা তাকে খুঁজে বের করার জন্য প্রশাসনের সহায়তা চেয়েছেন।
এই ঘটনার পর, নৌকা ও গাড়ি চালিয়ে চরে প্রবেশের ওপর স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের সম্ভাবনা প্রকাশ করেছে। এছাড়া, ভবিষ্যতে এ ধরনের সংঘর্ষ রোধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।
বিবাদিত চরের দখল ও গুলিবর্ষণের ফলে সৃষ্ট মানবিক ক্ষতি ও সামাজিক অশান্তি নিয়ে স্থানীয় সমাজে শোকের ছায়া ছড়িয়ে রয়েছে। মৃতদের পরিবারগুলো শোকসন্তপ্ত, আর আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করা হচ্ছে। তদন্ত চলমান থাকায়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আরও তথ্য পাওয়া গেলে তা জনসাধারণের জানাতে হবে।



