বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বুধবার দুপুরে আগারগাঁওয়ের পরিসংখ্যান ভবনে ‘সিটিজেন পারসেপশন সার্ভে (সিপিএস) ২০২৫’ শীর্ষক জরিপের চূড়ান্ত ফলাফল উপস্থাপন করে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, সরকারি সেবা গ্রহণের সময় ঘুষ প্রদানকারী নাগরিকের মধ্যে নোয়াখালী জেলা সর্বোচ্চ শেয়ার দেখিয়েছে, আর চাঁপাইনবাবগঞ্জে এই হার সর্বনিম্ন।
জরিপটি দেশের ৬৪টি জেলায় ৪৫,৮৮৮টি বাড়ি থেকে ১৮ বছর ও তার বেশি বয়সের ৮৪,৮০৭ নারী-পুরুষকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। অংশগ্রহণকারীদের দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নিরাপত্তা, সুশাসন, সরকারি সেবার মান, দুর্নীতি, ন্যায়বিচার ও বৈষম্যসহ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের (এসডিজি) ১৬টি লক্ষ্য থেকে ৬টি লক্ষ্য মূল্যায়ন করা হয়েছে।
বিবিএসের সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রকাশ পেয়েছে, গত এক বছরে সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে ঘুষ প্রদানকারী ৩৫.১৬ শতাংশ respondent সর্বোচ্চ সম্পদশ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। তুলনায়, সবচেয়ে দরিদ্র গোষ্ঠীর মধ্যে এই হার ২৫.৯২ শতাংশে সীমাবদ্ধ। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে ঘুষের প্রবণতা বাড়ছে বলে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
বিভিন্ন জেলার ঘুষের হার তুলনা করলে নোয়াখালী শীর্ষে রয়েছে; এখানে ৫৭.১৭ শতাংশ নাগরিক সরকারি সেবা পেতে ঘুষ প্রদান করেছেন বলে জানান। দ্বিতীয় স্থানে কুমিল্লা আসে, যেখানে ৫৩.৪৭ শতাংশ respondent একই রকম অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। ফরিদপুরে ৫১.৭০ শতাংশ, ভোলায় ৪৯.০১ শতাংশ এবং সিরাজগঞ্জে ৪৮.৩৭ শতাংশ মানুষ ঘুষের কথা স্বীকার করেছেন।
অন্যদিকে, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ঘুষের হার সর্বনিম্ন রেকর্ড হয়েছে, যদিও সুনির্দিষ্ট শতাংশ সংখ্যা প্রকাশিত হয়নি। এই ফলাফল জেলা পর্যায়ে দুর্নীতির মাত্রা ব্যাপকভাবে ভিন্নতা নির্দেশ করে এবং নীতিনির্ধারকদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
প্রকাশনা অনুষ্ঠানে পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলিয়া আক্তার প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তিনি জরিপের গুরুত্ব ও ফলাফলের ভিত্তিতে সরকারি সেবার স্বচ্ছতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
বিবিএসের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে সভায় পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মাসুদ রানা চৌধুরী এবং সিপিএস প্রকল্পের পরিচালক রাশেদ-ই মাসতাহাব অংশ নেন। এছাড়া সেন্সাস উইংয়ের পরিচালক মো. মাহামুদুজ্জামান স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন।
অনুষ্ঠানের মঞ্চনির্দেশনা বিবিএসের এসডিজি সেল ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা (উপপরিচালক) মো. আলমগীর হোসেন পরিচালনা করেন। তিনি জরিপের পদ্ধতি, নমুনা নির্বাচন এবং ডেটা বিশ্লেষণ প্রক্রিয়া সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করেন।
সার্ভের ফলাফল থেকে স্পষ্ট যে, ঘুষের প্রবণতা কেবল অর্থনৈতিক স্তরের সঙ্গে নয়, বরং ভৌগোলিক অবস্থান ও স্থানীয় প্রশাসনিক সংস্কৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। নোয়াখালীতে উচ্চ ঘুষের হার স্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে নাগরিকের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের ফলে হতে পারে, যেখানে চাঁপাইনবাবগঞ্জে সেবার প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছ বলে ধারণা করা যায়।
বিবিএসের বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, ঘুষের হার কমাতে স্বচ্ছতা, ডিজিটাল সেবা ও নাগরিক অভিযোগ ব্যবস্থার শক্তিশালীকরণ অপরিহার্য। জরিপের তথ্যকে ভিত্তি করে সরকার ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট জেলা ও সেক্টরে লক্ষ্যভিত্তিক নীতি প্রণয়ন করতে পারে।
অধিকন্তু, এই জরিপের ফলাফল জাতীয় দুর্নীতি বিরোধী কৌশল ও এসডিজি লক্ষ্য অর্জনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হবে। ভবিষ্যতে বিবিএস একই পদ্ধতিতে নিয়মিত জরিপ চালিয়ে ঘুষের প্রবণতা ও অন্যান্য সেবা-সংক্রান্ত সমস্যার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করার পরিকল্পনা করেছে।



