সিভারস্ক, দোনেৎস্কের পূর্বাঞ্চলীয় শহর, রাশিয়ান সেনাবাহিনীর হাতে পড়ে এবং ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী কৌশলগতভাবে পেছনে সরে যায়। এই পদক্ষেপটি তীব্র লড়াই এবং কঠোর শীতল আবহাওয়ার পরিণতি, যা উভয় পক্ষের জন্য উচ্চমানের ক্ষতি নিয়ে আসে।
ইউক্রেনের জেনারেল স্টাফ টেলিগ্রামে জানিয়েছে, রাশিয়ান বাহিনী মানবশক্তি ও সামরিক সরঞ্জামে সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। ছোট ছোট ইউনিটে বিভক্ত রাশিয়ান সৈন্যরা খারাপ আবহাওয়াতেও ধারাবাহিকভাবে ইউক্রেনীয় ইউনিটের ওপর চাপ বজায় রাখে।
এই পরিস্থিতিতে ইউক্রেনীয় কমান্ডাররা সৈন্যদের প্রাণ রক্ষা এবং সামগ্রিক যুদ্ধক্ষমতা বজায় রাখতে পিছু হটার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা উল্লেখ করেছে, প্রত্যাহারের আগে রাশিয়ান বাহিনীর ওপর উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি আরোপ করা হয়েছে।
সিভারস্কের নিকটবর্তী এলাকায় এখনও ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর উপস্থিতি রয়েছে এবং তারা শত্রুর অগ্রগতি থামাতে সক্ষম হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে রাশিয়ান দখল শক্তিশালী হওয়ায় শহরের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে রাশিয়ান হাতে চলে গেছে।
ইউক্রেনীয় পর্যবেক্ষণ সাইট ‘ডিপ স্টেট’ মঙ্গলবার রাতে জানিয়েছে, রাশিয়ান বাহিনী সিভারস্কের পাশাপাশি সুমি অঞ্চলের সীমান্তের কাছে অবস্থিত হ্রাবোভস্ক গ্রামটিকেও দখল করেছে। এই গ্রামটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি সুমি ও দোনেৎস্কের সংযোগস্থল।
ডিসেম্বর ১১ তারিখে রাশিয়ান লেফটেন্যান্ট জেনারেল সের্গেই মেদভেদেভ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে জানিয়েছিলেন যে সিভারস্ক দখল করা হয়েছে। সেই সময়ে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ এই দাবিকে অস্বীকার করেছিল, তবে বর্তমান তথ্য তা প্রত্যাখ্যান করতে পারে না।
কিয়েভ ইনডিপেনডেন্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রায় দশ হাজার বাসিন্দা সমন্বিত এই ছোট শহরটি উত্তর দোনেৎস্কের প্রতিরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। এটি স্লাভিয়ানস্ক ও ক্রামাতোরস্কের মতো বড় শহরের রক্ষার জন্য ঢাল হিসেবে কাজ করত।
রয়টার্সের তথ্য অনুসারে, ডিসেম্বরের শুরুর দিকে রাশিয়া প্রায় ১৯ শতাংশ ইউক্রেনীয় ভূখণ্ড দখল করে, যার মধ্যে লুহানস্কের পুরো অঞ্চল এবং দোনেৎস্কের ৮০ শতাংশের বেশি অন্তর্ভুক্ত। দোনেৎস্কের স্থিতি আন্তর্জাতিক শান্তি আলোচনার প্রধান বাধা হিসেবে রয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন যে শান্তি পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছে, তাতে ক্রাইমিয়া, লুহানস্ক এবং দোনেৎস্ককে রাশিয়ার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা রয়েছে। এই প্রস্তাবটি ইউক্রেনের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার প্রশ্ন তুলেছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কি উল্লেখ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র দোনেৎস্ক থেকে ইউক্রেনীয় সেনা প্রত্যাহার করে সেখানে ‘মুক্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল’ গঠনের জন্য চাপ দিচ্ছে, যা রাশিয়া ‘অসামরিক অঞ্চল’ হিসেবে বর্ণনা করে। এই পারস্পরিক দৃষ্টিভঙ্গি কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে।
একজন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন, সিভারস্কের হারানো ইউক্রেনের উত্তর দোনেৎস্কের প্রতিরক্ষা শৃঙ্খলে বড় ফাঁক তৈরি করেছে এবং রাশিয়ার অগ্রগতি দ্রুততর হতে পারে। তিনি আরও যোগ করেন, এই পরিবর্তনটি শীতকালীন যুদ্ধের গতিপথে নতুন জটিলতা যোগ করেছে।
অবস্থানগত দৃষ্টিকোণ থেকে, সিভারস্কের পতন রাশিয়ান বাহিনীর জন্য লুহানস্কের দিকে অগ্রসর হওয়া এবং দোনেৎস্কের বাকি অংশে নিয়ন্ত্রণ বিস্তারের সুযোগ তৈরি করে। একই সঙ্গে ইউক্রেনীয় বাহিনীর জন্য কৌশলগত পুনর্গঠন ও রিজার্ভ শক্তি সংহত করার প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে তুলেছে।
পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া এবং রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের সমাধানের জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কীভাবে বিকশিত হবে, তা নজরে থাকবে। বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি পরিকল্পনা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তা প্যাকেজের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
এই পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের সামরিক ও কূটনৈতিক নেতৃত্বকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যাতে শত্রুর অগ্রগতি থামিয়ে দেশের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। সিভারস্কের দখল কেবল একটি শহরের হার নয়, বরং পূর্ব ইউক্রেনের সামগ্রিক কৌশলগত ভারসাম্যের পরিবর্তনকে নির্দেশ করে।



