যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে পাঁচজনের ভিসা প্রত্যাখ্যান করেছে, যার মধ্যে যুক্তরাজ্যের দুইজন ক্যাম্পেইনারও অন্তর্ভুক্ত। ইমরান আহমেদ, সেন্টার ফর কাউন্টারিং ডিজিটাল হেটের প্রধান এবং ক্লেয়ার মেলফোর্ড, গ্লোবাল ডিসইনফরমেশন ইনডেক্সের সিইও, এই সিদ্ধান্তের প্রধান শিকার। ভিসা প্রত্যাখ্যানের কারণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্বে থাকা বিভাগটি তাদেরকে আমেরিকান সামাজিক মিডিয়া প্ল্যাটফর্মকে নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি দমন করতে চাপ দেওয়ার চেষ্টা করার অভিযোগ করেছে।
এই পাঁচজনের মধ্যে ইমরান আহমেদ ও ক্লেয়ার মেলফোর্ডের পাশাপাশি ফ্রান্সের এক প্রাক্তন ইউরো কমিশনার এবং জার্মানিতে অবস্থিত একটি অনলাইন ঘৃণার বিরোধী সংস্থার দুই উচ্চপদস্থ সদস্যও অন্তর্ভুক্ত। সকলেরই ভিসা প্রত্যাখ্যানের নোটিশ একই সময়ে প্রকাশিত হয়, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তীব্র আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে এই পদক্ষেপটি এমন গোষ্ঠী ও ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া, যারা আমেরিকান টেক কোম্পানিগুলোর ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপের জন্য প্রচার চালিয়েছে। স্টেট ডিপার্টমেন্টের মতে, এই গোষ্ঠীগুলো সামাজিক মিডিয়া প্ল্যাটফর্মকে তাদের বিরোধী মতামত দমন করতে বাধ্য করার চেষ্টা করেছে, যা আমেরিকান ভাষণ স্বাধীনতার ওপর অনধিকার হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত।
রাষ্ট্র সচিব মার্কো রুবিও এই সিদ্ধান্তকে “গ্লোবাল সেন্সরশিপ-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স” এর অংশ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ট্রাম্পের “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতি বিদেশি সেন্সরদের আমেরিকান ভাষণকে লক্ষ্য করে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপকে অগ্রাহ্য করে না। রুবিওর বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া জোর দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রের অধীনস্থ অধিনায়িকা সারা বি. রজার্স গ্লোবাল ডিসইনফরমেশন ইনডেক্সের ওপর আর্থিক দায়িত্বের অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, এই সংস্থা যুক্তরাষ্ট্রের করদাতার অর্থ ব্যবহার করে আমেরিকান সংবাদ ও মত প্রকাশকে সেন্সর ও ব্ল্যাকলিস্ট করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। রজার্সের এই মন্তব্যের পর গ্লোবাল ডিসইনফরমেশন ইনডেক্সের মুখপাত্র সংস্থাটিকে “অধিকর্তা-সদৃশ দমনমূলক পদক্ষেপ” এবং “সরকারি সেন্সরশিপের এক ভয়ানক কাজ” বলে সমালোচনা করেন।
ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল ম্যাক্রন এই সিদ্ধান্তকে “হুমকি” হিসেবে উল্লেখ করে ইউরোপীয় স্তরে তীব্র নিন্দা প্রকাশ করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি আঘাতকারী বলে সমালোচনা করেন। ম্যাক্রনের মন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে ব্যাপক সমর্থন পেয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নিয়ে আলোচনা বাড়িয়ে তুলেছে।
ইমরান আহমেদের পটভূমি যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। তিনি পূর্বে লেবার মন্ত্রী হিলারি বেনের সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন এবং বর্তমান লেবার নেতা কির স্টারমারের প্রধান কর্মী মর্গান ম্যাকসুইফি CCDH-তে পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষের মতে, আহমেদের সংস্থা পূর্বে বায়ডেন প্রশাসনের সঙ্গে কাজের ইতিহাস রয়েছে, যা তাকে “সহযোগী” হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
ক্লেয়ার মেলফোর্ড ২০১৮ সালে গ্লোবাল ডিসইনফরমেশন ইনডেক্স প্রতিষ্ঠা করেন, যা মিথ্যা তথ্যের বিস্তার পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে। সংস্থাটি অলাভজনক ভিত্তিতে কাজ করে এবং ডিজিটাল পরিবেশে মিথ্যা তথ্যের প্রভাব কমাতে লক্ষ্য রাখে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাখ্যানের পর সংস্থার মুখপাত্র যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে “অধিকর্তা-সদৃশ দমনমূলক আক্রমণ” এবং “মুক্ত মত প্রকাশের ওপর আক্রমণ” বলে সমালোচনা করেন।
এই ভিসা প্রত্যাখ্যানের ফলে যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপীয় সম্পর্কের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও মানবাধিকার সংস্থাগুলি এই সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপ্রেক্ষিতে মূল্যায়ন করবে, আর ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের নাগরিকদের ভিসা অধিকার রক্ষার জন্য কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে পারে। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতি কীভাবে পরিবর্তিত হবে এবং সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলো কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এই সিদ্ধান্তের পর যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানবাধিকার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক তীব্র হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এবং তাদের সমর্থকরা যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে স্বৈরশাসনমূলক এবং বৈশ্বিক সেন্সরশিপের দিকে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার এই পদক্ষেপকে জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য অপরিহার্য বলে যুক্তি দিচ্ছে।



