মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কংগ্রেসে জমা দেওয়া বার্ষিক নিরাপত্তা প্রতিবেদনে চীনের কৌশলগত লক্ষ্যগুলো প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চীনের শীর্ষ নেতৃত্ব আরুণাচল প্রদেশকে নিজের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে, যা ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধের নতুন মাত্রা যোগ করে। একই প্রতিবেদনে তাইওয়ানকে চীনের সঙ্গে একীভূত করা “স্বাভাবিক প্রয়োজনীয়তা” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা পরিবেশে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।
চীনের এই নতুন কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি একটি বিস্তৃত পুনর্জাগরণ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুনর্জাগরণকৃত চীন বিশ্বমঞ্চে উচ্চতর অবস্থানে পৌঁছাতে চায় এবং এমন একটি সামরিক বাহিনী গড়ে তুলবে, যা যেকোনো ধরণের অভিযানে লড়াই করে জয়লাভ করতে সক্ষম হবে। পাশাপাশি, চীন তার ভূগোলিক অখণ্ডতা, নিরাপত্তা এবং উন্নয়নমূলক স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
পাকিস্তান-চীন সম্পর্কের দিকে নজর দিলে, প্রতিবেদনে উভয় দেশের সামরিক সহযোগিতা আরও গভীর হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বেইজিং ইসলামাবাদের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক শক্তিশালী করার পাশাপাশি, যৌথভাবে জে-এফ-১৭ যুদ্ধবিমান উৎপাদন প্রকল্পে কাজ করছে। পাকিস্তান বর্তমানে চীনের একমাত্র গ্রাহক, যারা জে-১০ যুদ্ধবিমান ক্রয় করতে সক্ষম। এই সহযোগিতা চীনের জন্য দক্ষিণ এশিয়ায় কৌশলগত উপস্থিতি বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অতিরিক্তভাবে, চীন বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ড্রোন এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের মাধ্যমে তার প্রভাব বিস্তৃত করছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চীন পাকিস্তানের সঙ্গে ৩ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার মাধ্যমে আটটি ইউয়ান-ক্লাস সাবমেরিন বিক্রি হবে। এই সাবমেরিনগুলো আধুনিক নৌবাহিনীর সক্ষমতা বাড়াবে এবং পাকিস্তানের সামরিক কৌশলে নতুন মাত্রা যোগ করবে।
চীনের সামরিক উপস্থিতি সম্প্রসারণের আরেকটি সম্ভাব্য পদক্ষেপ হল পাকিস্তানে চীনের লিবারেশন আর্মি (PLA) ঘাঁটি স্থাপন করা। যদিও এটি এখনও পরিকল্পনা পর্যায়ে, তবে উভয় দেশের কৌশলগত সমন্বয়কে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে এই ধাপটি বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, যদি এই ঘাঁটি বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়ে তুলবে এবং ভারত-চীন সম্পর্কের উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই বিকাশগুলোকে কীভাবে গ্রহণ করা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেদন চীনের আক্রমণাত্মক কৌশলকে সতর্কতা হিসেবে তুলে ধরেছে এবং অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোর পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে। তদুপরি, ভারত সরকার ইতিমধ্যে আরুণাচল প্রদেশের ভূখণ্ডীয় অখণ্ডতা রক্ষার জন্য কূটনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের ইঙ্গিত দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, চীনের এই বহুমুখী কৌশল—আঞ্চলিক দাবি, সামরিক আধুনিকীকরণ এবং পারস্পরিক সামরিক সহযোগিতা—একটি সমন্বিত নীতি হিসেবে কাজ করছে, যা তার বৈশ্বিক প্রভাব বাড়াতে লক্ষ্যবদ্ধ। তবে, এই নীতি বাস্তবায়নের পথে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত এবং জাপানের মতো দেশগুলোর নীতি পরিবর্তন, চীনের কৌশলকে নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সারসংক্ষেপে, মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন চীনের আরুণাচল প্রদেশ এবং তাইওয়ান সংযুক্তিকরণ, পাশাপাশি পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা ও সাবমেরিন বিক্রয়কে তার বৃহত্তর কৌশলগত লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নের জন্য চীন তার সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে এবং আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়। ভবিষ্যতে এই পরিকল্পনাগুলোর অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া অঞ্চলের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।



