ফেব্রুয়ারি মাসে চীনের পূর্ব উপকূলের শিয়াওলিন জলের নিচে সমুদ্রতল ক্যাবল কেটে যাওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করে। চীনের শিয়াওলিন প্রদেশের ওয়েহাই পাবলিক সিকিউরিটি ব্যুরোর মতে, টোগো রেজিস্টার্ড হং তাই 58 নামের জাহাজে দুইজন তাইওয়ানীয় নাগরিক জড়িত ছিলেন, যারা চীনে হিমায়িত পণ্য চোরাচালান করার দীর্ঘমেয়াদী অপারেশনের অংশ হিসেবে জাহাজটি পরিচালনা করছিলেন।
চীনের তাইওয়ান বিষয়ক অফিসের প্রকাশ্যে বলা হয়েছে, তাইওয়ানের ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি (ডিপিপি) হং তাই 58 জাহাজকে ইচ্ছাকৃতভাবে সমুদ্রতল ক্যাবল ধ্বংসের জন্য ব্যবহার করার দাবি করে, যা পার্শ্ববর্তী উত্তেজনা বাড়াতে চায়। চীনা কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগকে অস্বীকার করে, ঘটনাটিকে “সাধারণ সামুদ্রিক ঘটনা” বলে উল্লেখ করে এবং তাইওয়ানীয় কর্তৃপক্ষের অতিরঞ্জন হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
তাইওয়ান সরকার জাহাজটি দ্বারা সৃষ্ট ক্ষতিকে “ধূসর অঞ্চল” বা “হাইব্রিড যুদ্ধ” কৌশল হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে, যেখানে সীমিত ধ্বংসাত্মক কাজের মাধ্যমে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। তাইওয়ানের মেইনল্যান্ড অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিলের মতে, চীন এই ধরনের কাজকে তার ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে বিবেচিত স্ব-শাসিত দ্বীপের উপর চাপ বাড়ানোর উপায় হিসেবে ব্যবহার করে।
জাহাজের চীনা ক্যাপ্টেনকে জুন মাসে তাইওয়ানীয় আদালত তিন বছরের কারাদণ্ড দেয়, কারণ তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে ক্যাবলকে ক্ষতিগ্রস্ত করার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। একই সময়ে, সাতজন চীনা ক্রু সদস্যকে কোনো অভিযোগ ছাড়াই চীনে ফেরত পাঠানো হয় এবং মূল ভূখণ্ডে তদন্তের অংশ হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
ওয়েহাই পাবলিক সিকিউরিটি ব্যুরো তদন্তের ফলাফল জানিয়ে ২৫০,০০০ ইউয়ান (প্রায় ৩৫,৫৬৯ ডলার) পর্যন্ত পুরস্কার ঘোষণা করেছে, যাতে সন্দেহভাজন তাইওয়ানীয় দুজনের তথ্য সরবরাহ করা হয়। ব্যুরোর মতে, সন্দেহভাজনদের উপাধি চিয়েন এবং চেন, এবং তারা ২০১৪ সাল থেকে চীনের কাস্টমস অফিসের কাঙ্ক্ষিত তালিকায় রয়েছে।
তাইওয়ানের মেইনল্যান্ড অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিলের মন্তব্যে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি এই মামলায় কোনো বিচারিক ক্ষমতা রাখে না, এবং তাইওয়ানীয় কর্তৃপক্ষের তদন্তকে স্বাধীন ও স্বচ্ছ বলে জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে, উভয় পক্ষের মধ্যে সমুদ্রতল ক্যাবল নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক শিপিং নিয়মের উপর আন্তর্জাতিক আলোচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
এই ঘটনা আন্তর্জাতিক সমুদ্র নিরাপত্তা সংস্থা এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, কারণ সমুদ্রতল ক্যাবল বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট ও টেলিকমিউনিকেশন সেবার মেরুদণ্ড। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, এমন ধরণের ক্ষতি কেবলমাত্র স্থানীয় যোগাযোগই নয়, গ্লোবাল ডেটা ট্রান্সমিশনেও বিশাল প্রভাব ফেলতে পারে।
চীনের শিয়াওলিন প্রদেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তা দপ্তর ভবিষ্যতে সমুদ্রতল ক্যাবল রক্ষা করার জন্য অতিরিক্ত নজরদারি ব্যবস্থা গ্রহণের পরিকল্পনা জানিয়েছে। একই সঙ্গে, তাইওয়ানীয় সরকারও ক্যাবল রক্ষণাবেক্ষণ ও সুরক্ষার জন্য নতুন প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর কথা প্রকাশ করেছে।
এই ঘটনার পর, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানসহ কয়েকটি প্রধান দেশ সমুদ্রতল অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরু করেছে। তারা সমুদ্রতল ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত করার সম্ভাব্য কৌশলগুলোকে “হাইব্রিড হুমকি” হিসেবে চিহ্নিত করে, এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে।
সারসংক্ষেপে, চীনের তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে যে দুইজন তাইওয়ানীয় নাগরিক হং তাই 58 জাহাজের পরিচালনায় জড়িত ছিলেন, যা ফেব্রুয়ারিতে সমুদ্রতল ক্যাবলকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। এই বিষয়টি চীন-তাইওয়ান সম্পর্কের উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্র নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর দৃষ্টিতে নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে উদ্ভাসিত হয়েছে। ভবিষ্যতে উভয় দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন, যাতে সমুদ্রতল অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।



