যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচজন কংগ্রেস সদস্য গতকাল প্রোফেসর মুহাম্মদ ইউনূস, যিনি বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, তাকে চিঠি পাঠিয়ে ফেব্রুয়ারি মাসে নির্ভুল ও স্বচ্ছ জাতীয় নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সমন্বয় করার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। চিঠিটি হাউস ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে এবং এতে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন স্পষ্ট করা হয়েছে।
চিঠি লেখকগণ হলেন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য গ্রেগরি ডব্লিউ মিকস, বিল হুইজেনগা, সিডনি কমলাগার-ডোভ, জুলি জনসন এবং টম আর সুওজ্জি। মিকস ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির সদস্য, হুইজেনগা দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক উপকমিটির চেয়ারম্যান এবং কমলাগার-ডোভ মধ্য এশিয়া বিষয়ক উপকমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করেন। তাদের সম্মিলিত বার্তায় বলা হয়েছে, জাতীয় সংকটের সময়ে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করার জন্য ইউনূসের স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগকে তারা স্বাগত জানায়।
চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের নাগরিকদের অধিকার রয়েছে যে তারা সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে একটি মুক্ত ও ন্যায়সঙ্গত নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের সরকার বেছে নিতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় কোনো দলকে অবৈধভাবে বাদ দেওয়া বা কোনো অপরাধের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের ওপর যথাযথ আইনি পদক্ষেপ না নেওয়া হলে তা গণতন্ত্রের মৌলিক নীতির সঙ্গে বিরোধপূর্ণ হবে, আইনপ্রণেতারা তা জোর দিয়ে বলেছেন।
মার্কিন আইনপ্রণেতারা আরও উল্লেখ করেছেন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের রক্ষার জন্য প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের পরিবর্তে সত্যিকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তারা বলেছে, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে স্থগিত করা ন্যায়সঙ্গত নয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তারা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উন্নয়নের জন্য স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত নির্বাচনকে অগ্রাধিকার দিতে আহ্বান জানিয়েছে।
চিঠিতে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের “গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার” হিসেবে উল্লেখ করে, দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করার ইচ্ছা প্রকাশ করা হয়েছে। আইনপ্রণেতারা জানান, তারা এবং তাদের সরকার আগামী মাসগুলোতে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রগতিতে সহায়তা করতে প্রস্তুত এবং অন্তর্বর্তী সরকার অথবা ভবিষ্যতে নির্বাচিত সরকার যেই হোক না কেন, তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে ইচ্ছুক।
এই চিঠি প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে। পূর্বে আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে থাকা দেশটি এখন যুক্তরাষ্ট্রের এই সরাসরি আহ্বানকে একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। নির্বাচনের প্রস্তুতি, ভোটার তালিকা আপডেট, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয় প্রক্রিয়ায় এই চিঠি উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের দায়িত্ব এখন এই চিঠিতে উল্লিখিত সুপারিশগুলোকে বাস্তবায়নের দিকে মনোনিবেশ করা। তিনি এবং তার দলকে সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে, আইনপ্রণেতারা যে ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার রক্ষার কথা উল্লেখ করেছেন, তা বাস্তবায়নের জন্য আইনি কাঠামোকে শক্তিশালী করা এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
উল্লেখযোগ্য যে, এই চিঠি হাউস ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির ওয়েবসাইটে প্রকাশের পর ইতিমধ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশ থেকে সমর্থনমূলক মন্তব্য পাওয়া গেছে। তবে, দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়া এখনও স্পষ্ট নয়। কিছু দল এই আহ্বানকে স্বাগত জানাতে পারে, আবার অন্যরা জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন তুলতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচজন কংগ্রেস সদস্যের এই চিঠি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে একটি নতুন দৃষ্টিকোণ যোগ করেছে। এটি স্বাধীন ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় সমন্বয়, আইনি ন্যায়বিচার এবং মানবাধিকার রক্ষার ওপর জোর দেয়। আগামী সপ্তাহগুলোতে এই চিঠির প্রভাব কীভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং তা দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রগতিতে কী ভূমিকা রাখবে, তা পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।



