লিবিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ আল-হাদ্দাদ এবং চারজন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা মঙ্গলবার রাতের দিকে তুর্কির আংকারা শহরের কাছাকাছি হায়মানা জেলায় অবতরণে ব্যর্থ একটি ব্যবসায়িক জেটের ধসে যাওয়ায় প্রাণ হারিয়েছেন।
টুর্কি অভ্যন্তরীণ মন্ত্রণালয়ের মুখ্য কর্মকর্তা আলি ইয়েরলিকায়া জানিয়েছেন, ফ্যালকন ৫০ ধরণের বিমানটি আংকারার এসেনবোগা বিমানবন্দর থেকে ১৭১০ GMT সময়ে উড়ে বেরিয়ে ৪২ মিনিট পর যোগাযোগ হারিয়ে যায়।
বিমানটি হায়মানা থেকে প্রায় ৭৪ কিলোমিটার (৪৫ মাইল) দূরে জরুরি অবতরণ চেয়েছিল, তবে যোগাযোগ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। টুর্কি সিভিল এয়ারপোর্ট কর্তৃপক্ষের মতে, উড়ানের ১৬ মিনিট পরই ইলেকট্রিক্যাল ত্রুটির কারণে পাইলট জরুরি অবতরণ আবেদন করেছিল।
বিমানটি মোট আটজনকে বহন করছিল: হাদ্দাদ, তার চারজন সহচর এবং তিনজন ক্রু সদস্য। তুর্কি প্রেসিডেন্সির যোগাযোগ বিভাগ প্রধান বুরহানেত্তিন দুরান টুইটারে উল্লেখ করেছেন, যাত্রী ও ক্রু উভয়ই জরুরি অবতরণ চেয়ে বিমান নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রকে জানিয়েছিল।
দুর্ঘটনায় হাদ্দাদ এবং তার চারজন সহকর্মী ছাড়াও তিনজন ক্রু সদস্যের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। টুর্কি বিচার মন্ত্রী ইলমাজ তুনচের মতে, আংকারা প্রধান প্রসিকিউটরের অফিস এই ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে।
লিবিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবদুলহামিদ দবেইবাহ ফেসবুকে প্রকাশিত একটি বার্তায় হাদ্দাদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং লিবিয়ার সামরিক নেতৃত্বের ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
হাদ্দাদের টুর্কি রক্ষামন্ত্রী ইয়াসার গুলের এবং তুর্কি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী সেলচুক বায়কর্তারোগলু সঙ্গে মঙ্গলবার আংকারায় আলোচনা শেষ করার পর লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপলিতে ফিরে যাওয়ার পথে বিমানটি দুর্ঘটনায় পড়ে। তার এই সফর লিবিয়ার রাজনৈতিক ও সামরিক সমন্বয়কে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছিল।
এই ঘটনার ফলে লিবিয়ার অভ্যন্তরীণ সংঘাতের গতিপথে নতুন অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। হাদ্দাদ লিবিয়ার জাতীয় সামরিক কমান্ডের প্রধান ছিলেন এবং গৃহযুদ্ধের বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে সমঝোতা ও নিরাপত্তা চুক্তি চালু করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। তার অকাল মৃত্যু লিবিয়ার সামরিক কাঠামোকে অস্থায়ীভাবে দুর্বল করতে পারে এবং গৃহযুদ্ধের প্রধান দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতার পুনর্বণ্টনকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
টুর্কি সরকার ঘটনাটিকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত একটি গুরুতর ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করছে। টুর্কি ও লিবিয়ার মধ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামরিক ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা গড়ে উঠেছে; হাদ্দাদের সঙ্গে গুলের এবং বায়কর্তারোগলুর আলোচনায় দু’দেশের যৌথ প্রশিক্ষণ, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং তেল-গ্যাস ক্ষেত্রের নিরাপত্তা বিষয়ক সমঝোতা অন্তর্ভুক্ত ছিল।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, টুর্কি এই দুর্ঘটনা তদন্তে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রাখবে এবং আন্তর্জাতিক বিমান নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করবে। তুর্কি বিচার মন্ত্রীর উদ্যোগে আংকারা প্রধান প্রসিকিউটরের অফিসের তদন্তের ফলাফল আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা (ICAO) ও ইউরোপীয় সিভিল এভিয়েশন সিকিউরিটি এজেন্সি (EASA) তে জানানো হবে।
অঞ্চলীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, লিবিয়ার সামরিক নেতৃত্বের হঠাৎ পরিবর্তন তুর্কি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের লিবিয়া নীতি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে দিতে পারে। লিবিয়ার গৃহযুদ্ধের সমাধানে টুর্কি যে ভূমিকা পালন করছে, তা এখনো অনিশ্চিত, তবে হাদ্দাদের মৃত্যু টুর্কির কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।
এই ঘটনার পরবর্তী ধাপগুলোতে লিবিয়ার সরকারী ও বিরোধী গোষ্ঠীর মধ্যে সামরিক সমন্বয়, টুর্কির তদন্তের ফলাফল এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ হবে। লিবিয়ার নিরাপত্তা পরিষদে (UNSC) এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মিসরসহ প্রধান আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়দের অবস্থান নির্ধারণে প্রভাব ফেলবে।
সারসংক্ষেপে, লিবিয়ার সামরিক শীর্ষ কর্মকর্তাদের মৃত্যু এবং টুর্কিতে বিমান দুর্ঘটনা উভয়ই লিবিয়া-টুর্কি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার নিরাপত্তা পরিবেশে নতুন জটিলতা যোগ করেছে। তদন্তের ফলাফল এবং লিবিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিবিধি এই ঘটনার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নির্ধারণে মূল ভূমিকা রাখবে।



