মঙ্গলবার ভেনেজুয়েলা জাতীয় পরিষদে একটি নতুন আইন অনুমোদিত হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ সমর্থকদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি আরোপের লক্ষ্য রাখে। এই আইন পাসের ঠিক আগে, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি তেলবাহী ট্যাংকার জব্দ করে, যা মাদুরো সরকারের মতে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং ‘সমুদ্রদস্যুতা’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
আইনটি উপস্থাপনকারী আইনপ্রণেতা জিউসেপ্পে আলেসান্দ্রেল্লো উল্লেখ করেন, এই পদক্ষেপটি দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা এবং জনগণের জীবনমানের অবনতি রোধের জন্য প্রয়োজনীয়। বর্তমানে জাতীয় পরিষদ মাদুরোর শাসক দলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যা আইনটি দ্রুত অনুমোদনে সহায়তা করেছে।
ভেনেজুয়েলা সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক নীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে, দাবি করে যে যুক্তরাষ্ট্র লাতিন আমেরিকায় সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়ে, তেলবাহী জাহাজ জব্দ, মাদক পাচারের অভিযোগে নৌকায় হামলা এবং ভেনেজুয়েলায় স্থল অভিযান চালানোর হুমকি দিয়ে দেশটির ওপর আক্রমণাত্মক চাপ বাড়িয়ে তুলেছে। ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রদূত সামুয়েল মোনকাদা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইনের সীমা অতিক্রম করে ভেনেজুয়েলাবাসীদের দেশ ত্যাগে বাধ্য করার চেষ্টা করছে।
চীন ও রাশিয়া উভয়ই যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করে। রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভাসিলি নেবেনজিয়া যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিকে একটি ‘ছক’ হিসেবে উল্লেখ করেন, যা ভবিষ্যতে অন্যান্য লাতিন আমেরিকান দেশকে লক্ষ্য করে ব্যবহার করা হতে পারে। চীনের প্রতিনিধিও একই রকম উদ্বেগ প্রকাশ করে, যদিও বিস্তারিত বক্তব্য প্রকাশিত হয়নি।
ভেনেজুয়েলা সরকারকে সমর্থন জানিয়ে কয়েকটি দেশ, যার মধ্যে রাশিয়া, চীন এবং কলম্বিয়া অন্তর্ভুক্ত, যুক্তরাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক আইনের মান বজায় রাখতে এবং উত্তেজনা কমাতে আহ্বান জানায়। অন্যদিকে, আর্জেন্টিনা, পানামা ও চিলির মতো ডানপন্থী সরকারগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ক্যারিবীয় অঞ্চলে বিশেষ অভিযান পরিচালনার জন্য বিমান ও সেনা পরিবহনকারী উড়োজাহাজ মোতায়েন করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, এটি দক্ষিণ আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের সর্ববৃহৎ নৌবহর। এই পদক্ষেপের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের তেলসম্পদ নিয়ন্ত্রণের ইচ্ছা রয়েছে বলে মাদুরো সরকার অভিযোগ করে।
মাদুরোর সরকার যুক্তরাষ্ট্রের এই সব কার্যক্রমকে ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বের ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই ধরনের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করতে আহ্বান জানায়। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের বৈধতা রক্ষা করার চেষ্টা করেন, তবে তার বক্তব্যের বিশদ এখনো প্রকাশিত হয়নি।
এই আইন পাসের ফলে ভেনেজুয়েলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়বে বলে বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন। মাদুরোর শাসন দল আশা করে, কঠোর আইনটি দেশের তেল শিল্পের স্বার্থ রক্ষা করবে এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে একটি আইনি বাধা তৈরি করবে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের তেল ট্যাংকার জব্দের পরিণতি হিসেবে ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও প্রভাব পড়তে পারে।
ভবিষ্যতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের আলোচনায় এই বিষয়টি পুনরায় উত্থাপিত হতে পারে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলো এবং ভেনেজুয়েলা সমর্থক দেশগুলো নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করবে। আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে এই বিরোধের সমাধান কী হবে, তা এখনো অনিশ্চিত, তবে উভয় পক্ষের জন্যই কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের মাত্রা বাড়বে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবেশও প্রভাবিত হবে। মাদুরোর শাসক দল আইনটি ব্যবহার করে দেশের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় জনমতকে একত্রিত করার চেষ্টা করতে পারে, আর বিরোধী দলগুলো যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপকে দেশের স্বায়ত্তশাসনের ক্ষতি হিসেবে তুলে ধরতে পারে।
সংক্ষেপে, ভেনেজুয়েলা জাতীয় পরিষদে পাস হওয়া নতুন আইন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক তেল ট্যাংকার জব্দের ঘটনা উভয়ই লাতিন আমেরিকায় শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া এবং পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপগুলোই নির্ধারণ করবে এই সংঘাতের চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা।



