যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার মহিরাণ গ্রামে ৩৯ বছর বয়সী রাজু রায়, শখের পাখি পালনকে আয়ের উৎসে রূপান্তর করে মাসে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা উপার্জন করছেন। তিনি সকালবেলায় তার বাড়ির ছাদে গুঞ্জনময় কবুতরের ডাক শোনেন, যা গ্রামবাসীর জন্য এক নতুন দৃষ্টান্ত। পাখি পালনের এই মডেলটি স্থানীয় যুবকদের মধ্যে স্বনির্ভরতার উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে।
রাজু রায়ের বাবা বিধান রায়, মা একমাত্র সন্তান হিসেবে তিনি ছোটবেলা থেকেই গ্রাম্য পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন। পরিবারিক সমর্থন ও পারিবারিক ঐতিহ্য তাকে স্বতন্ত্র পথে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রেখেছে।
শিক্ষা ক্ষেত্রে তিনি যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেন। উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পর তিনি একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মসংস্থান লাভ করেন।
ব্যাংকে তিন বছর কাজ করার পর ২০১৮ সালে তিনি চাকরি ছেড়ে নিজের ব্যবসা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। প্রথমে তিনি নিজের তিনতলা বাড়ির তলা-দ্বিতীয় তলায় ইলেকট্রনিক্সের দোকান চালু করেন, যা তার আর্থিক ভিত্তি গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
পাখি পালনের আগ্রহ তার শৈশবের স্মৃতি থেকে উদ্ভূত। বন্ধুদের কাছ থেকে সাত জোড়া কবুতর সংগ্রহের পর তিনি এই শখকে ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার পাখির সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং এখন তার ছাদে শত শত কবুতর বাস করে।
রাজুর বাড়ি তিনতলা কাঠামো, যার নিচ ও দোতলায় কয়েকটি ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠিত। ছাদের ওপর ইটের গাঁথুনি দিয়ে তৈরি দুটি টিনের ঘর এবং লোহার জালের সাহায্যে নির্মিত তিনটি খাঁচা রয়েছে। অতিরিক্তভাবে, চিলেকোঠার ছাদে কাঠ, পলিথিন ও লোহার জাল দিয়ে আরেকটি টিনের ঘর তৈরি করা হয়েছে। এই সব কাঠামো কবুতরের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করে।
কবুতরদের জন্য উঁচু করে লোহার তার দিয়ে ঘেরাবদ্ধ একটি ফাঁকা স্থানও রয়েছে, যেখানে পাখিগুলো উড়ে বেড়াতে পারে। প্রতিদিন ভোরবেলায় ছাদের গম্বুজে গুঞ্জনময় ডাক শোনার পর গ্রামবাসীরা এই দৃশ্যকে প্রশংসা করে। পাখির রঙের বৈচিত্র্য ও উড়ার দৃশ্য স্থানীয় পর্যটন আকর্ষণেও পরিণত হয়েছে।
রাজু জানান, পাখি পালন তার শখের পাশাপাশি মাঝেমধ্যে বিক্রির মাধ্যমে আয় হয়। তিনি বিক্রয় থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে পাখিদের স্বাস্থ্য ও খাবার নিশ্চিত করেন, ফলে পাখির সংখ্যা ও গুণগত মান বজায় থাকে। বর্তমানে তার মাসিক আয় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকার মধ্যে, যা তার ইলেকট্রনিক্স ব্যবসার পাশাপাশি একটি স্থিতিশীল আয় হিসেবে কাজ করে।
এই উদ্যোগের ফলে মহিরাণ গ্রামে পাখি পালনের প্রতি নতুন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। তরুণরা রাজুর মডেল অনুসরণ করে স্বল্প মূলধনে পাখি পালন শুরু করছে এবং স্থানীয় বাজারে বিক্রির মাধ্যমে অতিরিক্ত আয় অর্জন করছে।
রাজু রায়ের গল্পটি দেখায় কীভাবে শখকে সঠিক পরিকল্পনা ও পরিকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করলে তা আয়ের উৎসে রূপান্তরিত হতে পারে। গ্রামাঞ্চলে স্বনির্ভরতা বাড়াতে এই ধরনের ছোট উদ্যোগগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
স্থানীয় প্রশাসনও পাখি পালনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সহায়তা প্রদান করলে এই মডেলটি আরও বিস্তৃত হতে পারে। এভাবে গ্রামীণ অর্থনীতির বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পাবে এবং যুবকদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।



