২৩ বছর বয়সী লোটি ক্রিসমাসে পরিবারিক সমাবেশে অংশ নিতে উচ্ছ্বসিত, তবে তার মিসোফোনিয়া রোগের কারণে তিনি কানে ইয়ারপ্লাগ ব্যবহার করে শোনার অস্বস্তি কমাতে বাধ্য। একই সময়ে ২১ বছর বয়সী জেন্না, যিনি দশ বছর বয়স থেকে এই রোগে ভুগছেন, ডিনারের সময় ইয়ারফোন ব্যবহার করে পরিস্থিতি সামলাচ্ছেন। উভয়ই উল্লেখ করেন যে, উৎসবের সময়ের সাধারণ শব্দগুলো তাদের জন্য অপ্রতিরোধ্য চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
লোটি ১৬ বছর বয়স থেকে মিসোফোনিয়া নিয়ে সংগ্রাম করছেন; তিনি বলেন, অন্যের চিবানো, সিপ করা, নাক পরিষ্কার করা ইত্যাদি শব্দ শোনার সঙ্গে সঙ্গে তার শরীর টানটান হয়ে যায় এবং হঠাৎ প্যানিকের অনুভূতি আসে। তিনি শারীরিকভাবে ঝুঁকির মুখে আছেন এমন অনুভব করেন এবং এই শব্দগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেন। এই অস্বস্তি তাকে ক্রিসমাসের আনন্দময় পরিবেশেও অস্বস্তিকর করে তুলেছে।
মিসোফোনিয়া হল এমন একটি স্নায়বিক অবস্থা, যেখানে নির্দিষ্ট শব্দের প্রতি সহনশীলতা হ্রাস পায়, বিশেষত মুখ, গলা বা মুখের গতিবিধি থেকে উৎপন্ন শব্দ। চিবানো, শ্বাস নেওয়া, আঙুল টোকা দেওয়া, অথবা কাগজের গুঞ্জন ইত্যাদি সাধারণ শোনার উদাহরণই রোগীর জন্য তীব্র অস্বস্তি সৃষ্টি করতে পারে। এই শব্দগুলো শোনার সময় রোগীর মস্তিষ্কে স্বয়ংক্রিয়ভাবে হুমকির সংকেত পাঠায়, ফলে শারীরিক ও মানসিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
ইউকে-তে ২০২৩ সালে কিংস কলেজ লন্ডন ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা মিসোফোনিয়া রোগের বিস্তার নিয়ে গবেষণা করেন এবং প্রকাশ করেন যে প্রায় প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন এই সমস্যায় ভুগছেন। অর্থাৎ, মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০% মানুষই এই শব্দ-সংবেদনশীলতা নিয়ে দৈনন্দিন জীবনে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এই পরিসংখ্যান দেখায় যে, মিসোফোনিয়া কোনো বিরল অবস্থা নয়, বরং সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে প্রভাবিত করে।
উৎসবের সময়ে চিবানোর শব্দ, পানীয়ের সিপের শব্দ, অথবা উপহারের প্যাকেজিংয়ের গুঞ্জন বিশেষভাবে তীব্র ট্রিগার হিসেবে কাজ করে। লোটি উল্লেখ করেন, এই ধরনের শব্দগুলো তার মধ্যে উদ্বেগের সঞ্চার করে এবং ক্রিসমাসের আনন্দকে ভয়াবহ অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত করে। তিনি বলেন, যদিও পরিবার তার অবস্থার প্রতি সহানুভূতিশীল, তবু তিনি অন্যদের অস্বস্তি না দিতে নিজের স্বস্তি ত্যাগ করতে বাধ্য বোধ করেন।
পরিবারের সমর্থন থাকা সত্ত্বেও, লোটি তার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য নিজেকে সীমাবদ্ধ করতে বাধ্য হন। তিনি ইয়ারপ্লাগ ব্যবহার করে শব্দের তীব্রতা কমিয়ে রাখেন, তবে একই সঙ্গে তিনি উদ্বেগের কারণে সামাজিক মিথস্ক্রিয়া থেকে দূরে সরে যান। এই ধরনের আত্ম-সীমাবদ্ধতা রোগীর মানসিক স্বাস্থ্যের উপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে, যা অতিরিক্ত উদ্বেগ ও একাকিত্বের দিকে নিয়ে যায়।
শব্দের প্রতি সংবেদনশীলতা রোগীর সামাজিক জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে; কখনও কখনও রোগী সম্পূর্ণ সামাজিক সমাবেশ এড়িয়ে চলে। লোটি এবং জেন্না উভয়ই উল্লেখ করেন যে, সাধারণ শোনার শব্দগুলো তাদের জন্য এমন মানসিক চাপ তৈরি করে যে তারা পার্টি বা পারিবারিক ভোজে অংশ নিতে অনিচ্ছুক হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতি সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বাড়ায় এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
জেন্না তার ডিনার সময় ইয়ারফোন ব্যবহার করে শব্দকে ব্লক করেন, আর অন্য দিনগুলোতে তিনি নিজেকে একা রাখেন যাতে অপ্রয়োজনীয় শব্দের সংস্পর্শ না হয়। তার মতে, এই পদ্ধতি অস্থায়ীভাবে অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করে, তবে দীর্ঘমেয়াদে পেশাদার থেরাপি ও আচরণগত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা শোনার সংবেদনশীলতা কমাতে কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি এবং সাউন্ড থেরাপি সহ বিভিন্ন পদ্ধতি সুপারিশ করেন।
মিসোফোনিয়া রোগী ও তাদের পরিবারকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও সমর্থন প্রদান করা গুরুত্বপূর্ণ। শোনার অস্বস্তি কমাতে ইয়ারপ্লাগ, হোয়াইট নোয়েজ মেশিন, অথবা শান্ত পরিবেশ তৈরি করা সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি, পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করে উপযুক্ত থেরাপি গ্রহণ করা রোগীর জীবনের মান উন্নত করতে পারে। আপনি কি আপনার বা আপনার প্রিয়জনের শোনার অস্বস্তি সম্পর্কে আরও জানার ইচ্ছা রাখেন? সঠিক সহায়তা ও সমঝোতা দিয়ে উৎসবের সময়কে আবার আনন্দময় করা সম্ভব।



