কোভিড-১৯ টিকাদান গর্ভবতী নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব দেখিয়ে নতুন গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। কানাডার একটি বৃহৎ স্বাস্থ্য ডেটাবেসে এপ্রিল ২০২১ থেকে ডিসেম্বর ২০২২ পর্যন্ত গর্ভবতী নারীদের কোভিড সংক্রমণ ও টিকাদানের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় ডেল্টা ও ওমিক্রন দুইটি প্রধান ভাইরাসের সময়কাল অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
গর্ভবতী অবস্থায় টিকাদান করা নারীরা সংক্রমণের পর গুরুতর রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ডেল্টা সময়ে টিকাদান করা এবং পরে সংক্রমিত হওয়া নারদের মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশই হাসপাতালে ভর্তি হয়, যেখানে টিকাদান না করা নারদের মধ্যে ১৩.৫ শতাংশ ভর্তি হয়। ওমিক্রন সময়ে এই হার যথাক্রমে ১.৫ শতাংশ এবং ৫ শতাংশে নেমে আসে।
টিকাদান করা গর্ভবতী নারীদের শিশুরা সময়মতো জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনা বেশি। একই গবেষণায় দেখা যায়, টিকাদান করা গর্ভবতী নারীদের নবজাতকের প্রিম্যাচিউর জন্মের হার টিকাদান না করা নারীদের তুলনায় কম। এই ফলাফল জ্যামা (JAMA) জার্নালে ১৫ ডিসেম্বর প্রকাশিত হয়েছে।
শিশুদের ক্ষেত্রে টিকাদানের সুরক্ষা আরও স্পষ্ট হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নয়টি রাজ্যের ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য নেটওয়ার্কের তথ্য ব্যবহার করে করা গবেষণায় দেখা যায়, নয় মাস থেকে চার বছর বয়সের শিশুদের মধ্যে টিকাদান করা হলে জরুরি বিভাগ বা ত্বরিত সেবা কেন্দ্রে কোভিড-সদৃশ রোগের জন্য ভিজিটের ঝুঁকি ৭৬ শতাংশ কমে। অর্থাৎ টিকাদান করা শিশুরা একই সময়ে ৭৬ শতাংশ কম জরুরি সেবার প্রয়োজন অনুভব করে।
পাঁচ থেকে সতেরো বছর বয়সের শিশুদের জন্য টিকাদানের কার্যকারিতা ৫৬ শতাংশ হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে। এই তথ্য মর্বিডিটি অ্যান্ড মোর্টালিটি উইকলি রিপোর্টে ১১ ডিসেম্বর প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণাটি একই ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য নেটওয়ার্কের উপর ভিত্তি করে, যা বিভিন্ন বয়সের গ্রুপে টিকাদানের সুরক্ষা ও কার্যকারিতা যাচাই করে।
বয়স্কদের ক্ষেত্রে ফ্রান্সের একটি বৃহৎ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, টিকাদান করা ১৮ থেকে ৫৯ বছর বয়সের প্রাপ্তবয়স্কদের সামগ্রিক মৃত্যুর ঝুঁকি কমে। ফরাসি ন্যাশনাল হেলথ ডেটা সিস্টেমের তথ্য ব্যবহার করে প্রায় ২৩ মিলিয়ন টিকাদান করা এবং প্রায় ৬ মিলিয়ন টিকাদান না করা ব্যক্তির মৃত্যুর হার তুলনা করা হয়েছে। ফলাফল দেখায়, টিকাদান করা গ্রুপে সব কারণের মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
এই গবেষণাগুলো একসাথে দেখায় যে কোভিড-১৯ টিকাদান শুধুমাত্র সংক্রমণ রোধে নয়, গুরুতর রোগ, হাসপাতাল ভর্তি, প্রিম্যাচিউর জন্ম এবং সামগ্রিক মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে কার্যকর। গর্ভবতী নারী, নবজাতক এবং শিশুদের জন্য টিকাদান একটি অতিরিক্ত সুরক্ষা স্তর প্রদান করে, যা পরিবার ও সমাজের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন, টিকাদান গ্রহণের সময়সূচি ও ডোজের সঠিকতা বজায় রাখা জরুরি। গর্ভবতী নারীদের জন্য টিকাদান পরিকল্পনা তাদের গর্ভাবস্থার প্রথম ত্রৈমাসিকের পরে শুরু করা যেতে পারে, তবে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য অবস্থার ভিত্তিতে ডাক্তারের পরামর্শ অনুসরণ করা উচিত।
শিশুদের ক্ষেত্রে, নবজাতক থেকে চার বছর বয়সের মধ্যে টিকাদান করলে জরুরি সেবার ব্যবহার কমে এবং রোগের তীব্রতা হ্রাস পায়। পঞ্চম থেকে সতেরো বছর বয়সের শিশুদের জন্যও টিকাদান চালিয়ে যাওয়া উচিত, যাতে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী থাকে।
ফ্রান্সের বিশাল ডেটা বিশ্লেষণ দেখায়, টিকাদান করা প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মৃত্যুর ঝুঁকি কমে, যা দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যের জন্য টিকাদানের গুরুত্বকে পুনরায় নিশ্চিত করে। টিকাদান না করা গ্রুপে তুলনামূলকভাবে বেশি মৃত্যুর হার দেখা গেছে, যা জনস্বাস্থ্যের নীতি নির্ধারণে টিকাদান প্রচারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
সামগ্রিকভাবে, এই গবেষণাগুলো কোভিড-১৯ টিকাদানের বহুমুখী সুবিধা তুলে ধরে এবং গর্ভবতী নারী, শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য টিকাদানকে একটি অপরিহার্য সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে সুপারিশ করে। আপনার পরিবারে টিকাদান সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন বা উদ্বেগ থাকলে, নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত।
আপনার মতামত কী? গর্ভবতী নারী ও শিশুদের টিকাদান নিয়ে আপনি কীভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছেন?



