বাংলাদেশ সরকার ও বিমান বাহিনী ২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকার বিমান বাহিনীর সদর দপ্তরে ইতালির প্রতিরক্ষা সরবরাহকারী লিওনার্ডো S.p.A. এর সঙ্গে ইউরোফাইটার টাইফুন মাল্টি-রোল যুদ্ধবিমান ক্রয়ের জন্য একটি চিঠি‑অফ‑ইন্টেন্ট (LOI) স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তি দেশের আকাশসীমা রক্ষার ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ সীমিত সামরিক শক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে উপস্থিত ছিল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর ধ্বংসপ্রায় অবকাঠামো, অর্থনৈতিক সংকট এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে দেশটি গড়ে উঠেছিল। প্রাথমিকভাবে সীমানা রক্ষার জন্য সামরিক কাঠামো গড়ে তোলাই প্রধান লক্ষ্য ছিল, তবে দীর্ঘমেয়াদী আধুনিকায়নের কোনো সুসংহত পরিকল্পনা ছিল না।
দশক ধরে সামরিক ব্যয় ধীরে ধীরে বাড়লেও, অধিকাংশ অর্থ বেতন, স্থায়ী খরচ এবং দৈনন্দিন পরিচালনায় ব্যয় হয়েছে। সামরিক আধুনিকায়ন, নতুন অস্ত্র ক্রয় এবং উন্নত প্রযুক্তি সংযোজনের জন্য মোট বাজেটের মাত্র দুই থেকে চার শতাংশই বরাদ্দ করা হয়েছে। ফলে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় সামরিক ক্ষমতা পিছিয়ে রয়েছে।
২০২৫ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নৌবাহিনী ও আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করার পাশাপাশি দেশীয় সমরাস্ত্র কারখানা উন্নয়নের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিদেশি প্রতিরক্ষা সরবরাহকারীদের সঙ্গে চুক্তি আলোচনা শুরু হয়েছে, যার মধ্যে বিমান বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানো এবং আধুনিক অস্ত্র প্রযুক্তি অর্জন অন্তর্ভুক্ত।
ইতালির সঙ্গে স্বাক্ষরিত LOI-তে ইউরোফাইটার টাইফুনের প্রাথমিক ক্রয় চুক্তি অন্তর্ভুক্ত, যা ২০২৫ সালের শেষের দিকে ঢাকা বিমান বাহিনীর সদর দপ্তরে সম্পন্ন হবে বলে জানানো হয়েছে। এই যুদ্ধবিমানটি বহুমুখী রোলের জন্য ডিজাইন করা, যা আকাশসীমা রক্ষা, আক্রমণাত্মক মিশন এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধসহ বিভিন্ন কাজ সম্পাদন করতে সক্ষম।
বাংলাদেশ বিমান বাহিনী এই চুক্তিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছে, কারণ টাইফুনের মতো উচ্চ প্রযুক্তির বিমান যুক্ত হলে দেশের সামরিক ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। তবে চুক্তি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে, চূড়ান্ত শর্তাবলী ও ডেলিভারির সময়সূচি পরবর্তীতে নির্ধারিত হবে।
ইতালির পাশাপাশি তুরস্কের সঙ্গেও যুদ্ধবিমান, আক্রমণাত্মক বিমান এবং আক্রমণ হেলিকপ্টার ক্রয়ের আলোচনার সূচনা হয়েছে। উভয় দেশের সঙ্গে সমরাস্ত্র, রাডার, ড্রোন এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম কেনার জন্য প্রাথমিক চুক্তি (LOI) বা আলোচনা পর্যায়ে রয়েছে।
এইসব আলোচনার পেছনে দেশের সামরিক আধুনিকায়নকে ত্বরান্বিত করার ইচ্ছা রয়েছে, যাতে সীমান্ত রক্ষা, আকাশসীমা নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করা যায়। সরকার উল্লেখ করেছে, সামরিক শক্তি বাড়াতে হলে স্বনির্ভরতা ও প্রযুক্তি স্থানীয়ভাবে বিকাশ করাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বছরের পর বছর ধরে সামরিক ব্যয়ের ধীর বৃদ্ধি সত্ত্বেও, আধুনিক অস্ত্রের জন্য বরাদ্দ করা বাজেটের অংশ সীমিত থাকায় দেশীয় উৎপাদন ও গবেষণায় মনোযোগ বাড়াতে হবে। সামরিক কারখানা শক্তিশালী করা, স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো এবং বিদেশি প্রযুক্তি স্থানীয়করণকে অগ্রাধিকার দেওয়া পরিকল্পনার অংশ।
প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সামরিক ক্ষমতার তুলনা প্রায়ই আলোচনার বিষয় হয়ে থাকে। যদিও ভারত ও অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় দেশের তুলনায় বাংলাদেশের সামরিক শক্তি এখনও পিছিয়ে, তবে সাম্প্রতিক চুক্তি ও আলোচনাগুলি এই ফাঁক কমাতে সহায়তা করতে পারে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন।
আলোচনার পরবর্তী ধাপ হিসেবে সরকার ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট চুক্তিগুলোর চূড়ান্ত শর্তাবলী নির্ধারণ, অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং ডেলিভারির সময়সূচি নির্ধারণের কাজ করবে। একই সঙ্গে নৌবাহিনী ও সাইবার নিরাপত্তা ক্ষেত্রেও সমানভাবে আধুনিকায়ন পরিকল্পনা চালু রয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, ২০২৫ সালের এই চুক্তি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা নীতির একটি নতুন দিক নির্দেশ করে, যেখানে আকাশসীমা রক্ষার জন্য উচ্চমানের যুদ্ধবিমান যুক্ত করা, দেশীয় সমরাস্ত্র উৎপাদন বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বকে শক্তিশালী করা অন্তর্ভুক্ত। ভবিষ্যতে এই পদক্ষেপগুলো দেশের নিরাপত্তা কাঠামোকে আরও দৃঢ় করবে বলে আশা করা হচ্ছে।



