দৈনিক ইত্তেফাক ২৪ ডিসেম্বর ১৯৫৩ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়, আর আজ ৭৩ বছর পূর্ণ হওয়ার উপলক্ষে তার প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালিত হয়েছে। প্রকাশনা শহর ঢাকা থেকে শুরু হয়, যখন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তেজনাপূর্ণ ও পরিবর্তনের সীমানায় ছিল। ভাষা আন্দোলনের পরবর্তী বছরগুলোতে জাতীয় চেতনা জাগ্রত হচ্ছিল, আর ইত্তেফাক সেই সময়ের সংবাদমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
১৯৫৩ সালের শেষের দিকে, পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ তীব্রতর হচ্ছিল, এবং নতুন সংবাদপত্রের প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছিল। ইত্তেফাকের সূচনা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের মুখপাত্রের ভূমিকা থেকে হয়, যা দেশের স্বায়ত্তশাসন ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার লক্ষ্যে কাজ করছিল। প্রকাশনা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি দেশের রাজনৈতিক আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা নিতে শুরু করে।
প্রতিষ্ঠার সময় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ইত্যাদি বিশিষ্ট ব্যক্তিরা ইত্তেফাকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর অবদানও উল্লেখযোগ্য, যিনি প্রকাশনা নীতিতে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেন। এই নেতাদের সমন্বয় ইত্তেফাককে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের এক শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
প্রাক-স্বাধীনতা যুগে ইত্তেফাকের সম্পাদকীয় পাতা পশ্চিম পাকিস্তানের নীতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা প্রকাশ করে। দেশের স্বাধিকার অর্জনের লক্ষ্যে এটি সাহসিকতার সঙ্গে প্রতিবাদমূলক নিবন্ধ প্রকাশ করে, যা সময়ের শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। সংবাদপত্রের এই দৃঢ় অবস্থান তাকে স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভ্যানগার্ডে পরিণত করে।
ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে জাতীয়তাবাদী তত্ত্ব ও গণতান্ত্রিক আদর্শের সমন্বয় দেখা যায়, যা পাঠকদের মধ্যে স্বতন্ত্র চিন্তাধারার বিকাশ ঘটায়। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার লেখনীতে জাতির গঠন ও গণতন্ত্রের প্রতি দৃঢ় প্রতিজ্ঞা প্রকাশ পায়, যা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিতর্কের সঞ্চার ঘটায়। এই ধরনের বিশ্লেষণমূলক নিবন্ধগুলো দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে নতুন দিকনির্দেশনা দেয়।
স্বাধীনতার পরেও ইত্তেফাকের ভূমিকা অব্যাহত থাকে; এটি দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়গুলোতে সক্রিয়ভাবে আলোচনার মঞ্চ তৈরি করে। প্রকাশনা দেশের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান নিয়ে প্রস্তাবনা দেয় এবং সরকারকে নীতি নির্ধারণে দায়িত্বশীল রাখে। এভাবে ইত্তেফাককে শুধুমাত্র একটি দৈনিক পত্রিকাই নয়, বরং গণতান্ত্রিক চেতনার এক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করা হয়।
বার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। প্রকাশনার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রাক্তন সম্পাদকগণ উপস্থিত থেকে অতীতের সংগ্রাম ও ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনা করেন। অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা অংশ নেন, যা ইত্তেফাকের বহুমুখী স্বীকৃতি প্রকাশ করে।
কিছু সমালোচক ইত্তেফাকের রাজনৈতিক সংযুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, তারা দাবি করেন যে সংবাদপত্রটি এখনও নির্দিষ্ট দলীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। তবে প্রকাশনা দলটি এই অভিযোগকে অস্বীকার করে, এবং দাবি করে যে তার লক্ষ্য সর্বজনীন স্বার্থ রক্ষা করা। এই মতবিরোধ ইত্তেফাকের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে চলমান আলোচনার অংশ।
ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে ইত্তেফাকের ৭৩ বছর পূর্ণ হওয়া দেশের মিডিয়া ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে গণ্য হয়। এটি দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে, এবং নতুন প্রজন্মের পাঠকদের জন্য তথ্যের নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে কাজ করে চলেছে।
ভবিষ্যতে ইত্তেফাকের ভূমিকা আরও বিস্তৃত হতে পারে; ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তার উপস্থিতি বাড়িয়ে নতুন পাঠকগোষ্ঠীকে আকৃষ্ট করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি, দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার উন্নয়নে সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বকে আরও জোরদার করার লক্ষ্যে নীতি নির্ধারণে অংশগ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করা হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, দৈনিক ইত্তেফাকের ৭৩ বছর পূর্ণ হওয়া দেশের সংবাদমাধ্যমের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়। স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ পর্যন্ত এর অবদানকে স্বীকৃতি দিয়ে, দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে এর ভূমিকা আরও শক্তিশালী করার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।



