বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ন্যাশনাল ব্যাংকের মোট ঋণের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই ডিফল্ট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। একই সময়ে ডিফল্ট ঋণের পরিমাণ টাকার ৩২,০৩৯ কোটি, যা ব্যাংকের মোট ঋণের ৭৫.৪৬ শতাংশের সমান।
ব্যাংকের উচ্চ ডিফল্টের প্রধান কারণ হিসেবে সাম্প্রতিক মাসে দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর থাকা আদালতীয় স্টে অর্ডারগুলো বাতিল হওয়া উল্লেখ করা হয়েছে। প্রায় টাকার ৯,০০০ কোটি ঋণ, যা আগে আইনি সুরক্ষার আওতায় ছিল, এখন ডিফল্ট হিসেবে গণ্য হয়েছে।
এই ঋণগুলো মূলত পূর্ববর্তী সরকারের সময়কালে প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক সংযোগযুক্ত ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলিকে প্রদান করা হয়েছিল। স্টে অর্ডার বজায় থাকায় ব্যাংক এই ঋণগুলোকে নন‑পারফরমিং (NPL) হিসেবে চিহ্নিত করতে পারত না, ফলে প্রকৃত সমস্যার পরিমাণ গোপন রাখা সম্ভব হয়েছিল।
আগস্ট ২০২৪-এ সরকার পরিবর্তনের পর থেকে ঋণ পরিশোধের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। বেশ কয়েকটি বড় ঋণগ্রহীতা সম্পূর্ণভাবে পরিশোধ বন্ধ করে দেয়, যা ডিফল্টের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়।
ন্যাশনাল ব্যাংক ২০২২ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে ক্ষতি রিপোর্ট করছে এবং ব্যালেন্স শিট স্থিতিশীল করার জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকের নিট ক্ষতি টাকার ১,৪৫৮ কোটি, যা একই সময়ে ২০২৪ সালে টাকার ১,৩৬০ কোটি থেকে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ডিফল্ট ঋণের পরিমাণের উচ্চতা ব্যাংকের প্রভিশন তহবিলের ঘাটতিও বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমান প্রভিশন ঘাটতি টাকার ২৪,২৮২ কোটি, যার অর্থ ব্যাংকের কাছে সম্ভাব্য ঋণ ক্ষতি পূরণের জন্য পর্যাপ্ত রিজার্ভ নেই।
এই আর্থিক চাপ ব্যাংকের মূল কাঠামোকে দুর্বল করে তুলেছে। মূলধন অনুপাত, লিকুইডিটি রেশিও এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলো হ্রাসের প্রবণতা দেখাচ্ছে, যা ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদী টেকসইতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপ গ্রহণের সম্ভাবনা প্রকাশ করেছে। ঋণ পুনর্গঠন, অতিরিক্ত মূলধন সংগ্রহ বা সম্পদ বিক্রয়ের মতো বিকল্পগুলো বিবেচনা করা হতে পারে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে, ন্যাশনাল ব্যাংকের সমস্যার প্রভাব অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও পড়তে পারে। ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের হ্রাস এবং ক্রেডিটের প্রাপ্যতা সংকুচিত হওয়া সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, যদি ডিফল্টের পরিমাণ এবং প্রভিশন ঘাটতি দ্রুত হ্রাস না পায়, তবে ব্যাংকের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হতে পারে এবং আর্থিক বাজারে অস্থিরতা বাড়তে পারে। তাই, সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ন্যাশনাল ব্যাংকের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য।



