বৃহস্পতিবার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জুলাই‑সেপ্টেম্বর ২০২৫ ত্রৈমাসিকের শেষে বাংলাদেশের মোট বাহ্যিক ঋণ $112.12 বিলিয়নে নেমে এসেছে, যা জুনের শেষের $113.56 বিলিয়নের তুলনায় সামান্য কম। এই হ্রাস মূলত পাবলিক ও প্রাইভেট উভয় সেক্টরের ঋণ গ্রহণের হ্রাসের ফলে ঘটেছে।
বছরের তুলনায় দেখা যায়, ঋণ পরিমাণে ৭ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে; অর্থাৎ সেপ্টেম্বর ২০২৪-এ $104.37 বিলিয়ন ছিল, আর এখন $112.12 বিলিয়ন, যা $7.75 বিলিয়ন বৃদ্ধি নির্দেশ করে। এই বৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক ঋণ বাজারের পরিবর্তন ও দেশীয় অর্থনৈতিক চাহিদা প্রভাবিত করেছে।
বহু বিশ্লেষকের মতে, বাহ্যিক ঋণ হ্রাসের প্রধান কারণ দুইটি: এক, ঋণ পরিশোধের হার বৃদ্ধি, এবং দুই, নতুন ঋণ গ্রহণের পরিমাণ কমে যাওয়া। এই দৃষ্টিকোণটি কেন্দ্রীয় নীতি সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনের বিশ্লেষণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ফাহমিদা খাতুন উল্লেখ করেন, পূর্বে বড় বড় মেগা প্রকল্পের বাস্তবায়নের জন্য ঋণ গ্রহণ বাড়ছিল। তবে অস্থায়ী সরকারের অধীনে এই প্রকল্পগুলোর বেশিরভাগ স্থগিত করা হয়েছে এবং নতুন কোনো প্রকল্প শুরু হয়নি, ফলে ঋণ গ্রহণের গতি স্বাভাবিকভাবেই কমে গেছে।
বাহ্যিক ঋণের গঠন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পাবলিক সেক্টর এখনও সর্বোচ্চ ঋণধারী, যার মোট $92.54 বিলিয়ন, যা সমগ্র ঋণের চার‑পাঁচ ভাগের বেশি। এই বৃহৎ অংশ সরকারী খাতের ঋণ থেকে উদ্ভূত, যা অর্থনীতির সামগ্রিক ঝুঁকি প্রোফাইলকে প্রভাবিত করে।
সার্বিক সরকারি ঋণের মধ্যে, সাধারণ সরকারী ঋণ $80.48 বিলিয়নে পৌঁছেছে, যার বেশিরভাগই দীর্ঘমেয়াদী ঋণ। দীর্ঘমেয়াদী ঋণ সাধারণত অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ব্যবহার হয়, তবে বর্তমান সময়ে নতুন প্রকল্পের অভাবে এই ঋণের ব্যবহার সীমিত হতে পারে।
সরকারি ঋণের উপাদান হিসেবে সরকারী ঋণ $79.87 বিলিয়ন এবং সরকারী বন্ড $614.81 মিলিয়ন অন্তর্ভুক্ত। বন্ডের পরিমাণ গত এক বছর ধরে ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে, যা বাজারে সরকারী ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
অন্যান্য সরকারী কর্পোরেশন, বিশেষত রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার ঋণ $12.06 বিলিয়নে নেমে এসেছে, যা জুনের $13.22 বিলিয়নের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে। এই হ্রাসের প্রধান কারণ হল স্বল্পমেয়াদী দায়বদ্ধতা কমে যাওয়া, যা তাত্ক্ষণিক পরিশোধের চাপকে হ্রাস করেছে।
এই বিভাগে স্বল্পমেয়াদী দায়বদ্ধতা $3.21 বিলিয়নে নেমে এসেছে, যা পূর্বের উচ্চ স্তর থেকে উল্লেখযোগ্য হ্রাস। স্বল্পমেয়াদী ঋণ কমে যাওয়া আর্থিক স্থিতিশীলতা বাড়াতে সহায়ক, তবে দীর্ঘমেয়াদী ঋণের পরিমাণ এখনও উচ্চ মাত্রায় রয়েছে।
বেসরকারি সেক্টরের বাহ্যিক ঋণ $19.58 বিলিয়নে নেমে এসেছে, যা জুনের তুলনায় সামান্য কম। যদিও মোট ঋণ হ্রাস পেয়েছে, তবে বেসরকারি খাতের ঋণ কাঠামো এখনও উল্লেখযোগ্য, বিশেষ করে রপ্তানি ও আমদানি ভিত্তিক ব্যবসায়িক কার্যক্রমে নির্ভরশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য।
বেসরকারি খাতের স্বল্পমেয়াদী ঋণ $9.62 বিলিয়নে নেমে এসেছে, যা সামগ্রিক হ্রাসের প্রধান চালিকাশক্তি। স্বল্পমেয়াদী ঋণ কমে যাওয়া অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে নগদ প্রবাহের চাপ কমাতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদী ঋণের ভার এখনও উচ্চ।
ভবিষ্যৎ দৃষ্টিতে, মেগা প্রকল্পের স্থগিত থাকা এবং নতুন প্রকল্পের অনুপস্থিতি ঋণ গ্রহণের প্রবণতাকে স্থিতিশীল বা সামান্য হ্রাসের দিকে নিয়ে যেতে পারে। তবে বছর‑অন‑বছর ঋণ বৃদ্ধি ৭ শতাংশের বেশি হওয়ায়, ঋণ ব্যবস্থাপনা ও পরিশোধের সক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করা জরুরি, যাতে আর্থিক ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে থাকে।



