২১ ডিসেম্বর, ঢাকার তেজগাঁও এলাকায় অবস্থিত গ্লোবাল টিভি বাংলাদেশের সদর দফতরে কয়েকজন যুবক হুমকি জানায় যে, হেড অব নিউজ নাজনীন মুন্নীকে চাকরি থেকে বাদ না দিলে, প্রোথোম আলো ও ডেইলি স্টার অফিসে ঘটিত আগুনের মতোই তাদের দফতরে অগ্নিকাণ্ড ঘটাবে।
হুমকি দেওয়া তরুণরা নিজেদেরকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্য হিসেবে পরিচয় দেয় এবং দাবি করে যে, মুন্নীকে পদ থেকে অপসারণ না করা পর্যন্ত তারা আগুনের হুমকি বজায় রাখবে। একই দিনে, আন্দোলনের সভাপতি রিফাত রশিদও সংগঠনের এক সদস্যের সঙ্গে গ্লোবাল টিভি অফিসে গিয়ে স্মারকলিপি জমা দেওয়ার কথা স্বীকার করেন এবং জানায় যে, হুমকির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নাজনীন মুন্নী, যিনি জুলাই মাসে গ্লোবাল টিভি’র হেড অব নিউজ পদে যোগ দেন, পূর্বে ডিবিসি নিউজ চ্যানেলে অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর হিসেবে কাজ করতেন। হুমকি পাওয়ার পর তিনি ফেসবুকে পোস্ট করে জানান যে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মহানগর শাখা কমিটির নামে সাত‑আটজন ব্যক্তি তার অফিসে এসে হুমকি দিয়েছে এবং চাকরি না ছাড়লে আগুন লাগানোর ইঙ্গিত দিয়েছে।
মুন্নী এই হুমকিকে ধারাবাহিক মিডিয়া আক্রমণের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন এবং উল্লেখ করেন যে, তার বিরুদ্ধে এই রকম হুমকি দেওয়া তার পেশাগত অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্য বহন করে। তিনি আরও বলেন, এই ধরনের হুমকি তার কাজের স্বাধীনতাকে চ্যালেঞ্জ করে এবং মিডিয়া সংস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যথাযথ পদক্ষেপের দাবি রাখেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন গত বছর জুলাই‑আগস্টে অনুষ্ঠিত অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিয়েছিল। এরপর ২৮ ফেব্রুয়ারি, আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত জাতীয় নাগরিক কমিটির সমন্বয়ে নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠিত হয়। তবে কয়েক মাসের মধ্যে আন্দোলনের দৃশ্যমান কার্যক্রম কমে যায়, যদিও তার নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন নেতিবাচক ঘটনার খবর প্রকাশ পায়।
২৫ জুন, আন্দোলনের নতুন কমিটি গঠনের জন্য ভোট অনুষ্ঠিত হয় এবং নতুন কমিটির গঠন সম্পন্ন হয়। হুমকি সংক্রান্ত তথ্য জানার জন্য আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সভাপতি রশিদুল ইসলাম (রিফাত রশিদ) সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, মহানগর শাখার একটি সদস্য কেন্দ্রীয় নির্দেশনা ছাড়া কয়েকজনকে গ্লোবাল টিভি’র অফিসে পাঠায়। তিনি উল্লেখ করেন, সেই সদস্যের সঙ্গে স্মারকলিপি জমা দেওয়া হয়েছিল, তবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কোনো অনুমোদন ছিল না।
প্রোথোম আলো ও ডেইলি স্টার অফিসে ১৮ ডিসেম্বর রাতে সন্ত্রাসী হামলা ঘটায়, যেখানে ভাঙচুর এবং অগ্নিকাণ্ডের মাধ্যমে সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ঘটনা হুমকির পটভূমিতে উল্লেখ করা হয়েছে, যা হুমকি দেওয়া তরুণরা পূর্বের ঘটনার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিল।
গ্লোবাল টিভি’র ব্যবস্থাপনা এখন পর্যন্ত হুমকির প্রতিক্রিয়া জানায়নি, তবে নিরাপত্তা সংক্রান্ত ব্যবস্থা গ্রহণের সম্ভাবনা উল্লেখ করা হয়েছে। আইনগত দিক থেকে, হুমকি প্রদানকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক দায়ের সম্ভাবনা রয়েছে, যা ভবিষ্যতে মিডিয়া কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এই ঘটনার রাজনৈতিক প্রভাবও স্পষ্ট। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপি, এবং তার শাখা কমিটির কার্যক্রমের মধ্যে এই ধরনের হুমকি প্রকাশ পেলে, আন্দোলনের অভ্যন্তরীণ কাঠামো ও নেতৃত্বের স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। একই সঙ্গে, মিডিয়া সংস্থাগুলোর স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকারী ও আইনি কাঠামোর পুনর্বিবেচনা প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
বিষয়টি নিয়ে বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে, যদি হুমকির বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে মিডিয়া কর্মীদের ওপর আক্রমণ বাড়তে পারে এবং গণমাধ্যমের স্বতন্ত্রতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে বর্তমান পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে কোনো তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
গ্লোবাল টিভি’র হেড অব নিউজ নাজনীন মুন্নীর ওপর এই হুমকি, মিডিয়া স্বাধীনতা, রাজনৈতিক আন্দোলনের অভ্যন্তরীণ কাঠামো এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার সংযোগস্থলে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা দেশের মিডিয়া পরিবেশের নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূচক হবে।



