ধানমন্ডি, ঢাকা – ১৮ ডিসেম্বর মধ্যরাতে ছায়ানট সংস্কৃতি ভবনে অগ্নিকাণ্ড ও লুটপাটের ঘটনা ঘটার পর, সংগীত ও শিল্পের মাধ্যমে জাতিসত্তা ও সংস্কৃতির সুরক্ষার আহ্বান জানাতে মঙ্গলবার বিকেল চারটায় বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিবাদটি ছায়ানটের সদস্য, শিক্ষার্থী, শিল্পী এবং সাধারণ নাগরিকদের সমন্বয়ে গঠিত, যারা একত্রে গানের সুরে তাদের দৃঢ় সংকল্প প্রকাশ করেছে।
আক্রমণটি রাতের অন্ধকারে সংঘটিত হয়; অগ্নিকাণ্ডের সঙ্গে সঙ্গে ভবনের ভেতরে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও সম্পত্তি লুটের ঘটনা রেকর্ড করা যায়। একই রাতে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার প্রকাশনাগুলোর সদর দফতরেও অনুরূপ হামলা ঘটে, আর পরদিন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কার্যালয়েও একই রকম হিংসাত্মক কার্যক্রমের প্রতিবাদ জানানো হয়। এই ধারাবাহিক আক্রমণকে লক্ষ্য করে ছায়ানটের নেতৃত্ব একটি সংহতি সমাবেশের আয়োজন করে, যাতে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর আক্রমণকে নিন্দা করা যায়।
প্রতিবাদের স্থান ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোডে ছায়ানট ভবনের সামনের ফুটপাত। অংশগ্রহণকারীরা দীর্ঘ লাইন গঠন করে, প্রথমে কয়েকশো মানুষ একসাথে দাঁড়িয়ে, ধীরে ধীরে সাড়া বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত ২৭ নম্বর মোড় পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। দেরি করে আসা অংশগ্রহণকারীরাও সড়কের কিনারায় দাঁড়িয়ে সমাবেশে যোগ দেন, ফলে স্থানিক সংকোচন না হয়ে সমাবেশের পরিসর বৃদ্ধি পায়।
প্রধান প্রবেশদ্বারের সামনে একটি অস্থায়ী মঞ্চ স্থাপন করা হয়, যেখানে তবলা, হারমোনিয়াম, খোল ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র রাখা হয়। বাদ্যযন্ত্রের সুরে শিল্পীরা ধারাবাহিকভাবে গানের পরিবেশন করেন, যা সমাবেশের মূল সুরকে সমর্থন করে। মঞ্চের পাশে ছায়ানটের সভাপতি সারওয়ার আলী ও সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমদ লিসার উপস্থিতি সমাবেশের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
সমাবেশে ছায়ানটের শিক্ষক, বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী, দেশের বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী, নৃত্যশিল্পী, আবৃত্তিশিল্পী, চারুশিল্পী, দৃশ্যমাধ্যম শিল্পী, স্থপতি, আলোকচিত্রী, শিক্ষক, লেখক, গবেষক, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী, পরিবেশকর্মী এবং সংস্কৃতিসেবীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ অংশ নেয়। এই বহুমুখী অংশগ্রহণকারী গোষ্ঠী সমাবেশকে একাধিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমর্থন প্রদান করে, যা সাংস্কৃতিক নিরাপত্তার ব্যাপক চাহিদা তুলে ধরে।
গানগুলোর তালিকায় ‘ও আমার দেশের মাটি’, ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’, ‘মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম, মোরা ঝরনার মতো চঞ্চল’ ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত ছিল। অংশগ্রহণকারী গোষ্ঠী গানের সঙ্গে সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে গাই, যা সমাবেশের ঐক্যবদ্ধ শক্তিকে দৃশ্যমান করে। গানের কথায় দেশপ্রেমের উন্মাদনা, বাংলার প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়।
প্রতিবাদকারীরা জোর দিয়ে বলেন যে, দেশের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুরক্ষিত রাখা জাতির পরিচয় রক্ষার মৌলিক শর্ত। তারা দাবি করে যে, সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এই ধরনের হিংসাত্মক আক্রমণ রোধে তৎপরতা দেখাতে হবে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা না ঘটার জন্য কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এই ধরনের সাংগীতিক প্রতিবাদ কেবল সাংস্কৃতিক সংরক্ষণের দাবি নয়, বরং রাজনৈতিক দায়িত্বের প্রতি জনমতের তীব্র প্রত্যাশা প্রকাশ করে। আক্রমণের পরপরই বৃহৎ জনসমাগমের মাধ্যমে সরকারকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার চাপ বৃদ্ধি পাবে বলে অনুমান করা যায়।
সরকারি দিক থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সরাসরি মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি, তবে নিরাপত্তা বিভাগকে এই ধরনের আক্রমণ রোধে অতিরিক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হতে পারে। ভবিষ্যতে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করা এবং সুরক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি করা প্রয়োজন হতে পারে।
ছায়ানটের নেতৃত্বের মতে, এই সমাবেশের মাধ্যমে তারা শুধু প্রতিবাদই নয়, বরং একটি সংহতি বার্তা পাঠাতে চায়, যাতে সমাজের সব স্তরে সংস্কৃতির মূল্যবোধের প্রতি সম্মান ও রক্ষার ইচ্ছা জাগ্রত হয়। সমাবেশের পর অংশগ্রহণকারীরা সামাজিক মিডিয়ায় ছবি ও ভিডিও শেয়ার করে, যা আরও বেশি মানুষকে এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করে।
প্রতিবাদের পরবর্তী ধাপ হিসেবে, ছায়ানটের সদস্যরা আরও সমাবেশের আয়োজনের পরিকল্পনা করছেন, যাতে ধারাবাহিকভাবে সরকারকে সাংস্কৃতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো যায়। এছাড়া, তারা আইনগত পদক্ষেপের মাধ্যমে আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি রাখছে।
সারসংক্ষেপে, ছায়ানট সংস্কৃতি ভবনে আক্রমণের পর ধানমন্ডি রোডে সংগীত, নৃত্য ও শিল্পের সমন্বয়ে একটি বৃহৎ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে জাতিসত্তা ও সংস্কৃতির সুরক্ষার জন্য দৃঢ় প্রত্যয় প্রকাশ করা হয়। এই সমাবেশের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক দায়িত্বের প্রতি জনমতের তীব্র প্রত্যাশা স্পষ্ট হয়েছে, যা ভবিষ্যতে নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।



