স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা শাখা তিনটি পার্বত্য জেলা—বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে আর্মড পুলিশ মাউন্টেন ব্যাটালিয়ন ও তার সদর দপ্তর গড়ে তোলার পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে। প্রস্তাবটি পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় ২৪ ডিসেম্বর উপস্থাপিত হয়।
প্রকল্পের মোট অনুমানিক ব্যয় ৬৬৮ কোটি ৪৪ লাখ টাকা, যার মধ্যে প্রথম বছর থেকে তৃতীয় বছর পর্যন্ত ধাপে ধাপে খরচ নির্ধারিত। এডিবি (এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক) এই উদ্যোগের আর্থিক সহায়তা প্রদান করবে বলে জানানো হয়েছে, এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এডিপি (এডিবি ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম) এর অননুমোদিত নতুন প্রকল্প তালিকায় এটি অন্তর্ভুক্ত।
প্রকল্পটি জুলাই ২০২৩ থেকে শুরু করে জুন ২০২৮ পর্যন্ত সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১৯১ কোটি ৬৪ লাখ টাকা, পরের বছর ২৩৮ কোটি ১১ লাখ টাকা এবং ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ২৩৮ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয় করে ব্যাটালিয়ন গঠন ও অবকাঠামো স্থাপন করা হবে।
এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য পার্বত্য অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করা, নিরাপত্তা বজায় রেখে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের গতি ত্বরান্বিত করা। এছাড়া, একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পুলিশকে প্রযুক্তি-নির্ভর, শারীরিকভাবে সক্ষম ও মানসিকভাবে দৃঢ় করে তোলার জন্য প্রশিক্ষণ ও আধুনিক সরঞ্জাম সরবরাহ করা হবে।
পটভূমিতে দেখা যায়, পার্বত্য এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য জেলা পুলিশের পাশাপাশি বিশেষায়িত ফোর্সের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। ডিআইজি মাউন্টেন আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের পূর্ণাঙ্গ কার্যালয় ও ব্যাটালিয়ন গঠন হলে পাহাড়ি ও বাঙালি জনগণের মধ্যে সংঘর্ষের ঝুঁকি কমবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
বর্তমানে থানা-পর্যায়ের পুলিশ কর্মীরা মামলা তদন্ত, দৈনন্দিন দায়িত্ব ও ছুটির সময়সূচি মেনে চলতে ব্যস্ত, ফলে উচ্চ প্রযুক্তি সমৃদ্ধ সংগঠিত অপরাধ দমন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। জেলা পুলিশ সুপারিনটেনডেন্টরা এপিবিএন (এনফোর্সড পলিসি ব্যাটালিয়ন) সদস্যদের সহায়তা চেয়ে থাকেন, যা বিশেষায়িত শক্তি গঠনের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট করে।
দুর্গম পার্বত্য ভূখণ্ডে কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আধুনিক অবকাঠামো ও সুরক্ষিত সুবিধা গড়ে তোলার দাবি দীর্ঘদিন থেকে উঠে আসছে। আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের উপস্থিতি না থাকলে স্থানীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ফাঁক বাড়ে, যা সামাজিক অশান্তি ও অপরাধের সুযোগ সৃষ্টি করে।
প্রকল্পের আর্থিক সহায়তা এডিবি থেকে আসবে, যা পূর্বে পার্বত্য অঞ্চলে অবকাঠামো উন্নয়ন ও নিরাপত্তা প্রকল্পে অংশগ্রহণ করেছে। এডিবি এই ব্যাটালিয়নকে প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সরবরাহের মাধ্যমে সমর্থন দেবে বলে জানানো হয়েছে।
প্রস্তাবিত ব্যাটালিয়ন গঠন হলে পার্বত্য এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় জেলা পুলিশের অতিরিক্ত চাপ কমবে এবং বিশেষায়িত ইউনিটের মাধ্যমে দ্রুত প্রতিক্রিয়া সম্ভব হবে। এতে স্থানীয় ব্যবসা, পর্যটন ও কৃষি কার্যক্রমের নিরাপত্তা বাড়বে, যা আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা করবে।
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্যাটালিয়নের সদর দপ্তর ও প্রশিক্ষণ শিবির নির্মাণে আধুনিক সুবিধা, হাই-টেক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ও সাইবার সিকিউরিটি সিস্টেম অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এইসব উপাদান পার্বত্য অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোকে আধুনিকায়ন করবে এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।
প্রকল্পের অনুমোদন ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত হওয়ার পর, সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন পরিকল্পনা তৈরি করবে এবং নির্মাণ কাজের জন্য দরপত্র প্রকাশ করবে। পরবর্তী ধাপে ব্যাটালিয়নের কর্মী নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম সরবরাহের কাজ শুরু হবে, যা ২০২৮ সালের শেষের দিকে সম্পূর্ণ কার্যকরী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই উদ্যোগের রাজনৈতিক দিক থেকে পার্বত্য অঞ্চলের নিরাপত্তা ও উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকারকে এই প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন পার্বত্য জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করতে এবং দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।



