ফ্রান্সের জাতীয় ডাক ও ব্যাংকিং সংস্থা লা পোস্টে সোমবার একটি সন্দেহজনক ডিস্ট্রিবিউটেড ডিনায়াল‑অফ‑সার্ভিস (ডিডি‑ওএস) আক্রমণের ফলে তার ডিজিটাল সেবাগুলো অস্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এই আক্রমণটি কোম্পানির নেটওয়ার্কে ব্যাপক ব্যাঘাত সৃষ্টি করে, ফলে সব তথ্যপ্রযুক্তি সিস্টেমে প্রবেশাধিকার হারিয়ে যায়। লা পোস্টের মুখপাত্র জানিয়েছেন, আক্রমণটি একটি “বড় নেটওয়ার্ক ঘটনা” হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
ডিডি‑ওএস আক্রমণের ফলে লা পোস্টের অনলাইন মেইল, ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্ম, অফিসিয়াল ওয়েবসাইট এবং মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন সবই ব্যবহারকারীদের জন্য অপ্রাপ্য হয়ে পড়ে। এই সেবাগুলো সাধারণত গ্রাহকদের ইলেকট্রনিক চিঠিপত্র পাঠানো, অর্থ স্থানান্তর এবং অ্যাকাউন্ট ব্যবস্থাপনা সহ বিভিন্ন কাজের জন্য ব্যবহৃত হয়। সেবা বন্ধ হওয়ায় গ্রাহকদের দৈনন্দিন আর্থিক ও ডাক সংক্রান্ত কাজগুলোতে বাধা সৃষ্টি হয়েছে।
কোম্পানি প্রকাশিত বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, আক্রমণটি তাদের সব তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোকে প্রভাবিত করেছে এবং তাৎক্ষণিকভাবে সেবা পুনরুদ্ধারের জন্য জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। লা পোস্টের আইটি দল সমস্যার মূল কারণ শনাক্ত করে দ্রুত সমাধান খুঁজতে কাজ করছে। একই সঙ্গে, গ্রাহকদের অনলাইন সেবা ব্যবহার না করে শারীরিক শাখা ও পোস্ট অফিসে গিয়ে লেনদেন সম্পন্ন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
লা পোস্টের ব্যাংকিং শাখা, লা ব্যাংক পোস্টাল, নিজস্বভাবে একটি আলাদা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে জানায় যে তাদের মোবাইল অ্যাপ এবং অনলাইন ব্যাংকিং পোর্টালও সাময়িকভাবে অপ্রাপ্য। এই বাধা গ্রাহকদের মোবাইলের মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্স চেক, ট্রান্সফার এবং পেমেন্ট করার ক্ষমতাকে সীমিত করে দেয়। তবে, শাখা ভিত্তিক ব্যাংকিং সেবা এবং ক্যাশিয়ার কাউন্টারগুলো এখনও কাজ করছে।
গ্রাহকদের জন্য সবচেয়ে সহজ বিকল্প হিসেবে লা পোস্টে সরাসরি শাখা বা পোস্ট অফিসে গিয়ে ডাক ও ব্যাংকিং কাজ সম্পন্ন করার সুযোগ রাখা হয়েছে। অনলাইন সেবা বন্ধ থাকলেও, নগদ জমা, চেক জমা এবং প্যাকেজ পাঠানোর মতো মৌলিক সেবা শারীরিকভাবে চালু রয়েছে। কোম্পানি এই সময়ে গ্রাহকদের ধৈর্য ও সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানায়।
আক্রমণের প্রকৃত দায়িত্ব নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি। রাশিয়ার একটি হ্যাকটিভিস্ট গ্রুপের দাবি রয়েছে যে তারা এই ডিডি‑ওএস আক্রমণ চালিয়েছে, তবে লা পোস্টের নিরাপত্তা বিভাগ এই দাবিকে নিশ্চিত করেনি। তদন্তের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সাইবার নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর হাতে, যা আক্রমণের উৎস ও পদ্ধতি নির্ণয়ে কাজ করছে।
এই সাইবার আক্রমণটি ফ্রান্সে সাম্প্রতিককালে ঘটিত একাধিক নিরাপত্তা ঘটনার ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ আগে, একটি যাত্রীবাহী ফেরিতে দূরবর্তী নিয়ন্ত্রণ সফটওয়্যার সনাক্ত করা হয়, যা সম্ভাব্য হ্যাকিংয়ের ইঙ্গিত দেয়। একই সময়ে, ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ মন্ত্রণালয় একটি বড় ডেটা লিকের তথ্য প্রকাশ করে, যেখানে হ্যাকাররা ইমেইল অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করে গোপন নথি, যার মধ্যে অপরাধ রেকর্ডও অন্তর্ভুক্ত, চুরি করে।
ডেটা লিকের পরপরই, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ২২ বছর বয়সী এক সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করে, যদিও তার নাম প্রকাশ করা হয়নি। গ্রেফতারের মাধ্যমে তদন্তে অগ্রগতি হলেও, এই ব্যক্তি ও ডিডি‑ওএস আক্রমণের মধ্যে কোনো সংযোগ আছে কিনা তা এখনও অজানা।
সামগ্রিকভাবে, লা পোস্টের সেবা বন্ধ হওয়া ফ্রান্সের ডিজিটাল অবকাঠামোর উপর আস্থা হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি করে। লা পোস্ট এবং লা ব্যাংক পোস্টাল দেশের অন্যতম বৃহৎ আর্থিক ও ডাক সেবা প্রদানকারী, যার অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো দৈনন্দিন লেনদেনের জন্য অপরিহার্য। সেবা বন্ধের ফলে ব্যবসা, ব্যক্তিগত আর্থিক লেনদেন এবং সরকারি যোগাযোগে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় আক্রমণ মোকাবেলা এবং সিস্টেম পুনরুদ্ধারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। লা পোস্টের মুখপাত্র ভবিষ্যতে কোনো নতুন আপডেট বা সেবা পুনরায় চালু হওয়ার সময়সূচি সম্পর্কে জানাবেন। গ্রাহকদের অনলাইন সেবা পুনরায় চালু হওয়া পর্যন্ত শারীরিক শাখা ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ফরাসি সরকারও সাইবার নিরাপত্তা নীতি শক্তিশালী করার দিকে মনোযোগ বাড়িয়ে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি সাইবার ঘটনার ধারাবাহিকতা সরকারকে ডিজিটাল সিস্টেমের রক্ষা ও জরুরি প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। লা পোস্টের সেবা পুনরুদ্ধার এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা শীঘ্রই স্পষ্ট হবে।



