গাজা উপত্যকায় স্বাস্থ্য সেবা প্রায় ধসে পড়ার কিনারায় পৌঁছেছে। গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রধান মুনির আল‑বারশের মতে, হাজারো রোগী জরুরি চিকিৎসা না পেলে মৃত্যুর ঝুঁকিতে অথবা স্থায়ী অক্ষমতার মুখোমুখি। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের অব্যাহত অবরোধের ফলে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জাম হাসপাতালগুলোতে পৌঁছাচ্ছে না, যা রোগীর জীবনরক্ষার ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে সীমাবদ্ধ করেছে।
আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় জানানো হয়েছে যে, গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বর্তমানে ওষুধ, শল্যচিকিৎসা সামগ্রী এবং ডায়ালাইসিস যন্ত্রপাতি সহ প্রায় তিন-চতুর্থাংশ প্রয়োজনীয় সামগ্রী পেতে ব্যর্থ। বিশেষ করে অ্যানেস্থেটিক, গজ, সলিউশন এবং ডায়ালাইসিস ফ্লুইডের ঘাটতি গুরুতর, ফলে জরুরি শল্যচিকিৎসা ও রক্ত পরিষ্কারের কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতিও স্বাস্থ্য সেবাকে প্রভাবিত করছে। ধারাবাহিক বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা এবং জেনারেটরের অভাবের কারণে হাসপাতালের যন্ত্রপাতি চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে রোগীর পর্যবেক্ষণ, শ্বাসযন্ত্র সহায়তা এবং রক্ত সঞ্চালন সরঞ্জাম ব্যবহার সীমিত হয়েছে।
গাজা অঞ্চলে চলমান যুদ্ধের ফলে স্বাস্থ্য অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুই বছরেরও বেশি সময়ে কমপক্ষে ১২৫টি স্বাস্থ্য সুবিধা ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৩৪টি হাসপাতাল অন্তর্ভুক্ত। এই ধ্বংসাবশেষের ফলে রোগী ও স্বাস্থ্য কর্মীর চলাচল সীমাবদ্ধ হয়েছে এবং জরুরি সেবা প্রদান কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুদ্ধের সময় ইসরায়েলি বাহিনীর আক্রমণে প্রায় ১,৭০০েরও বেশি স্বাস্থ্য কর্মী নিহত হয়েছে। এছাড়া ৯৫জন ফিলিস্তিনি ডাক্তার ও চিকিৎসা কর্মী, যার মধ্যে গাজা থেকে ৮০জন, আটক করা হয়েছে। এই মানবসম্পদ ক্ষতি স্বাস্থ্য সেবার গুণগত মানকে আরও হ্রাস করেছে।
অক্টোবর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে গৃহীত একটি স্থগিত যুদ্ধ চুক্তি সত্ত্বেও, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ চুক্তির শর্ত অনুসারে নির্ধারিত পরিমাণে চিকিৎসা সামগ্রী প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে না। চুক্তিতে নির্ধারিত মেডিকেল ট্রাকের সংখ্যা পূরণ না হওয়ায় গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে ক্রমাগত সংকটের মুখে ফেলছে।
মুনির আল‑বারশের মতে, বর্তমান স্বাস্থ্য সংকট গাজা স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। তিন দশকেরও বেশি সময়ে এ ধরনের ব্যাপক ঘাটতি ও অবরোধ দেখা যায়নি। এই পরিস্থিতি রোগীর মৃত্যুহার বাড়িয়ে তুলছে এবং দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের উপর গুরুতর প্রভাব ফেলবে।
গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে যে, শল্যচিকিৎসা সামগ্রীর ঘাটতি রোগীর শল্যচিকিৎসা সময়সীমা বাড়িয়ে দিচ্ছে, ফলে রোগীর অবস্থার অবনতি দ্রুত ঘটছে। একই সঙ্গে ডায়ালাইসিস রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় তরল ও ফিল্টার সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে, যা কিডনি রোগীদের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলছে।
বিদ্যুৎ ঘাটতি ও জেনারেটরের অভাবের ফলে হাসপাতালের আইসোলেশন ইউনিট বন্ধ হয়ে গেছে, ফলে সংরক্ষিত ওষুধের গুণগত মান হ্রাস পাচ্ছে। তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের অভাবে সংক্রমণ ঝুঁকি বাড়ছে, যা ইতিমধ্যে দুর্বল রোগীদের জন্য অতিরিক্ত হুমকি।
গাজা অঞ্চলের স্বাস্থ্য কর্মীরা সীমিত সম্পদে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা প্রায়ই বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার সময় রোগীর জীবন রক্ষার জন্য ম্যানুয়াল পদ্ধতি ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন। এই পরিস্থিতি কর্মীদের শারীরিক ও মানসিক চাপ বাড়িয়ে তুলছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবিক সাহায্যকারী সংস্থাগুলি গাজা স্বাস্থ্য সিস্টেমের জন্য জরুরি সহায়তা আহ্বান জানাচ্ছে। তবে অবরোধের কারণে সরবরাহের গতি ধীর, ফলে রোগীর মৃত্যুহার বাড়তে পারে। এই সংকটের সমাধানে ত্বরিত চিকিৎসা সামগ্রী প্রবেশের অনুমতি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলি একত্রে আহ্বান জানিয়েছে যে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ অবিলম্বে চিকিৎসা সামগ্রীর প্রবেশে বাধা সরিয়ে দিক এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় জেনারেটর সরবরাহ করে। এই পদক্ষেপগুলো না নিলে গাজা জনগণের স্বাস্থ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও হুমকির মুখে পড়বে।
গাজা স্বাস্থ্য সংকটের বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করে, পাঠকরা কীভাবে মানবিক সহায়তা ও আন্তর্জাতিক চাপের মাধ্যমে এই পরিস্থিতি পরিবর্তন করতে পারেন, তা নিয়ে চিন্তা করা জরুরি। আপনার মতামত কী? গাজা রোগীদের জন্য ত্বরিত সাহায্য নিশ্চিত করার জন্য কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?



