গত শনিবার রাতের দিকে দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীর একটি দল প্রতিবাদে সমবেত হয়। প্রায় বিশজন অংশগ্রহণকারী প্রায় দুই দশ মিনিট ধরে স্লোগান ও ব্যানার তুলে মিশনের নীতির প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করে। একই সময়ে শিলিগুড়িতে, পশ্চিমবঙ্গের একটি ভিসা কেন্দ্রেও হিন্দু উগ্র গোষ্ঠী আক্রমণ চালায়, যেখানে কয়েকজন কর্মীকে হুমকি দেওয়া হয় এবং সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আক্রমণের পর শিলিগুড়ির বাংলাদেশ ভিসা কেন্দ্রকে অস্থায়ীভাবে বন্ধ করা হয়। বাংলাদেশ সরকার এই সিদ্ধান্তকে অনির্দিষ্টকালীন বলে জানায় এবং একই সঙ্গে দিল্লি ও আগরতলা মিশনের ভিসা ও কনস্যুলার সেবা বন্ধের নির্দেশ দেয়। সংশ্লিষ্ট মিশনগুলো পৃথক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সেবা বন্ধের তথ্য জানায় এবং পরবর্তী নোটিশ না আসা পর্যন্ত সকল সেবা স্থগিত থাকবে।
দিল্লিতে প্রতিবাদকারী গোষ্ঠীটি ‘অখণ্ড হিন্দু রাষ্ট্র সেনা’ নামে পরিচিত এবং তারা ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে স্লোগান ও ব্যানার দিয়ে মিশনের সামনে উপস্থিত হয়। প্রতিবাদে উল্লেখ করা হয় যে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে, যা ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বিবৃতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রোববার একটি বিবৃতি প্রকাশ করে, যেখানে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্য ও নির্যাতনের উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। একই বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ময়মনসিংহের একটি পোশাক কারখানার শ্রমিকের নির্মম হত্যাকাণ্ডকে সংখ্যালঘু নির্যাতনের উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
শিলিগুড়ি, কলকাতা ও গুআহাটি সহ অন্যান্য শহরে হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলো একই সময়ে প্রতিবাদ চালায়। মুম্বাইতে একটি সংবাদ সম্মেলনে তারা বাংলাদেশি মিশনের নীতি ও কর্মপদ্ধতি নিয়ে সমালোচনা করে এবং ভিসা সেবার বন্ধের দাবি জানায়।
এই ধারাবাহিক প্রতিবাদ ও ভিসা সেবা বন্ধের ফলে ঢাকা-দিল্লি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নতুন সংকটে পৌঁছেছে বলে বিশ্লেষকরা সতর্কতা প্রকাশ করছেন। তারা উল্লেখ করেন যে, দুই দেশের কূটনৈতিক সূত্রগুলো ইতিমধ্যে উত্তেজনা কমাতে পদক্ষেপের কথা আলোচনা করছে, তবে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কের স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে দিল্লি ও আগরতলা মিশনের ভিসা ও কনস্যুলার সেবা বন্ধের নোটিশ জারি করেছে। নোটিশে বলা হয়েছে যে, নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সেবা পুনরায় চালু করা হবে না এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হবে।
ভারতীয় দিক থেকে, হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীর দাবি ও প্রতিবাদকে স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে মিশনগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
দিল্লি হাইকমিশনের সামনে ঘটিত প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারী কিছু সদস্যের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি, তবে তারা হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত বলে অনুমান করা হচ্ছে। শিলিগুড়িতে আক্রমণকারী গোষ্ঠীর নামও ‘বিশ্ব হিন্দু পরিষদ’ এবং অন্যান্য উগ্র সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুই দেশের কূটনৈতিক মিথস্ক্রিয়ার প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশি কর্মচারী ও ভিসা আবেদনকারীরা সেবা বন্ধের ফলে প্রভাবিত হবে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, ব্যবসায়িক ভ্রমণকারী ও পারিবারিক ভিসা প্রার্থীরা দীর্ঘ সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে পারে।
বিশ্লেষকরা ভবিষ্যতে কী ধাপ নেওয়া হবে তা নিয়ে আলোচনা করছেন। তারা পরামর্শ দিচ্ছেন যে, উভয় পক্ষই নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করে এবং পারস্পরিক অভিযোগের সমাধানে সংলাপের পথ খুলে দিতে হবে। এছাড়া, সংখ্যালঘু অধিকার সংক্রান্ত উদ্বেগের সমাধানে স্বচ্ছ তদন্তের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করা হয়েছে।
দিল্লি ও শিলিগুড়িতে হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীর প্রতিবাদ এবং ভিসা সেবা বন্ধের পরিণতি দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের পুনর্গঠনকে জটিল করে তুলেছে। উভয় সরকারই পরিস্থিতি শীতল করার জন্য কূটনৈতিক চ্যানেল ব্যবহার করে সমাধান খোঁজার সম্ভাবনা প্রকাশ করেছে, তবে তা বাস্তবে কত দ্রুত বাস্তবায়িত হবে তা এখনো অনিশ্চিত।



