ঢাকা, ২৩ ডিসেম্বর – প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার প্রকাশনা কেন্দ্রের ওপর উগ্রপন্থী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর আক্রমণ, যার ফলে অগ্নিকাণ্ড, লুটপাট এবং নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীরের ওপর শারীরিক হেনস্থা ঘটেছে, তার নিন্দা জানাতে দেশের শীর্ষ ব্যবসা নেতারা একত্রিত হয়েছেন।
সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিত যৌথ প্রতিবাদ সভা, ‘মব ভায়োলেন্সে আক্রান্ত বাংলাদেশ’ শিরোনামে, ব্যবসা ও শিল্প সমিতি, সম্পাদক পরিষদ ও নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (নোয়াব) সমন্বয়ে আয়োজন করা হয়। সভা গত সোমবার সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয় এবং শেষে হোটেলের পার্শ্ববর্তী রাস্তায় মানববন্ধন গঠন করা হয়।
সভায় উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, পেশাজীবী সংস্থা, ব্যবসা সমিতি, সাংবাদিক সংস্থা, আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী এবং সাংস্কৃতিক কর্মী। সকল অংশগ্রহণকারী একসাথে প্রকাশনা ঘরগুলোর ওপর আক্রমণ, শায়ানট ভবন ও উদীচী সংস্থার অফিসে ঘটিত হিংসা এবং মিডিয়া ক্ষেত্রের নিরাপত্তা হুমকির নিন্দা করেন।
বিসিএমএ (বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন) এর প্রাক্তন সভাপতি আলমগীর কবীর বলেন, “আজকের এই সমাবেশে আমরা একাত্মতা প্রকাশ করছি। সরকারকে স্পষ্ট করে বলতে হবে, তারা কি আমাদের দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চায়, ব্যবসা‑বাণিজ্যকে দুর্বল করতে চায়, নাকি মিডিয়ার স্বাভাবিক কাজকর্মে বাধা দিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়? যদি এধরনের উদ্দেশ্য না থাকে, তবে তা প্রমাণ করা দরকার।”
মেট্রো চেম্বার (এমসিসিআই) এর সভাপতি কামরান টি. রহমান যোগ দেন, “যে ঘটনার মুখোমুখি হয়েছি, তার নিন্দা জানাতে এবং সংহতি প্রকাশের জন্য আজ এখানে সমবেত হয়েছি।” তিনি মিডিয়া নিরাপত্তা ও ব্যবসায়িক পরিবেশের স্থিতিশীলতা রক্ষার গুরুত্বের ওপর জোর দেন।
ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, “গণতন্ত্রের বিকাশের জন্য সহনশীলতা গড়ে তোলা অপরিহার্য; না হলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। প্রতিটি সরকারের সময়ে গণতন্ত্রের ওপর আঘাতের ঝুঁকি থাকে, এবং মতবিরোধ সহ্য না করা হলে সমাজের অগ্রগতি থেমে যায়।”
প্রতিবাদ সভার অংশগ্রহণকারীরা সরকারকে আহ্বান জানান, যাতে তারা মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নেয় এবং ব্যবসা‑বাণিজ্যের ক্ষতি রোধে কার্যকর নীতি প্রণয়ন করে। তারা উল্লেখ করেন, নিরাপদ পরিবেশ ছাড়া কোনো অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয় এবং মিডিয়া স্বাধীনতা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি।
সভায় আরও উল্লেখ করা হয় যে, শায়ানট ভবন ও উদীচী সংস্থার অফিসে সংঘটিত হিংসা, মিডিয়া কর্মীদের ওপর হুমকি এবং সম্পত্তি ধ্বংসের ঘটনা, দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি অবনতির ইঙ্গিত দেয়। এ ধরনের আক্রমণ শুধুমাত্র প্রকাশনা ঘরকে নয়, সমগ্র সমাজের সংহতি ও ন্যায়বিচারকে ক্ষুণ্ন করে।
ব্যবসা সমিতির প্রতিনিধিরা জোর দিয়ে বলেন, সরকার যদি সত্যিই দেশের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ হয়, তবে তা প্রমাণের জন্য মিডিয়া ও ব্যবসা উভয়ের জন্য সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তারা দাবি করেন, আক্রমণের দায়ী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া এবং ভবিষ্যতে এধরনের ঘটনা রোধে প্রোঅ্যাকটিভ নীতি গ্রহণ করা জরুরি।
প্রতিবাদে উপস্থিত বিভিন্ন সংস্থার নেতারা একে অপরের সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে, মিডিয়া নিরাপত্তা ও ব্যবসা‑বাণিজ্যের সুরক্ষার জন্য যৌথ কর্মপরিকল্পনা গঠনের প্রস্তাব দেন। তারা ভবিষ্যতে নিয়মিত সমাবেশের মাধ্যমে সরকারের নীতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় সমন্বয় সাধনের ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
এই সমাবেশের মাধ্যমে প্রকাশনা ঘরগুলোর ওপর আক্রমণকে একতরফা হিংসা হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর প্রতি আঘাতের রূপ হিসেবে বিবেচিত হয়। অংশগ্রহণকারীরা একমত যে, কোনো মতবিরোধ হিংসায় রূপ নিলে তা দেশের সামগ্রিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে।
সর্বশেষে, অংশগ্রহণকারীরা সরকারকে আহ্বান জানান, যাতে তারা মিডিয়া ও ব্যবসা‑বাণিজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ত্বরিত পদক্ষেপ নেয় এবং দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য দৃঢ় সংকল্প প্রকাশ করে। মানববন্ধনের মাধ্যমে একত্রিত হওয়া নাগরিকদের দৃঢ় ইচ্ছা, দেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির জন্য একসাথে কাজ করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।



