ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার এবং হুথি গোষ্ঠী দুজনই একত্রে বন্দী বিনিময়ের চুক্তি সম্পন্ন করেছে, যা জাতিসংঘের মাধ্যমে জানানো হয়েছে। এই চুক্তি অনুযায়ী উভয় পক্ষই হাজারো বন্দীকে মুক্তি দেবে, ফলে দেশের মানবিক সংকট কিছুটা কমে যাবে। চুক্তি স্বাক্ষরের খবর মঙ্গলবার প্রকাশিত হয়, এবং এটি দু’পক্ষের দীর্ঘমেয়াদী আলোচনার ফলাফল।
জাতিসংঘের ইয়েমেন বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গের মতে, এই চুক্তি দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ওমানের রাজধানী মাসকাটে অনুষ্ঠিত আলোচনার পর গৃহীত হয়েছে। গ্রুন্ডবার্গ চুক্তিটিকে “ইতিবাচক ও অর্থবহ পদক্ষেপ” বলে উল্লেখ করে, যা বন্দী ও তাদের পরিবারের কষ্ট কমাতে সহায়ক হবে। তিনি আরও জানান, চুক্তির কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য উভয় পক্ষের ধারাবাহিক সম্পৃক্ততা এবং আঞ্চলিক সমর্থন প্রয়োজন।
মাসকাটে অনুষ্ঠিত আলোচনায় উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা প্রায় দুই সপ্তাহ একত্রে বসে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। ওমানের মধ্যস্থতায় এই আলোচনাগুলি চালু হয়, যা ২০১৪ সালে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধের পর থেকে প্রথম বড় ধরণের মানবিক সমঝোতা হিসেবে বিবেচিত। আলোচনার সময় উভয় পক্ষই বন্দী মুক্তির সংখ্যা, বিনিময়ের শর্ত এবং বাস্তবায়নের সময়সূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
গ্রুন্ডবার্গের মন্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে, চুক্তির সফল বাস্তবায়নের জন্য কেবলমাত্র রাজনৈতিক ইচ্ছা নয়, বরং আঞ্চলিক দেশগুলোর সমন্বিত সমর্থনও অপরিহার্য। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই ধরনের সমঝোতা ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরের বন্দী মুক্তি এবং শান্তি প্রক্রিয়ার অগ্রগতিতে সহায়তা করবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব হল এই প্রক্রিয়াকে পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা।
হুথি প্রতিনিধিরা চুক্তিতে ১,৭০০ হুথি বন্দীকে ১,২০০ সরকারী বন্দীর সঙ্গে বিনিময় করার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। এতে সাতজন সৌদি নাগরিক এবং তেইশজন সুদানি নাগরিক অন্তর্ভুক্ত, যারা বর্তমানে হুথি নিয়ন্ত্রণে থাকা ক্যাম্পে আটক ছিলেন। হুথি দল এই বিনিময়কে তাদের মানবিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে বন্দীর অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
সরকারি দলের প্রতিনিধি মজেদ ফাদহাইলের মতে, এই চুক্তি হাজারো যুদ্ধবন্দীর মুক্তি নিশ্চিত করবে, যা দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ফাদহাইল উল্লেখ করেন, মুক্তি প্রাপ্ত বন্দীদের মধ্যে দুইজন সৌদি এয়ারফোর্সের পাইলট অন্তর্ভুক্ত, যারা যুদ্ধের সময় আটক হয়েছিলেন। এই পাইলটদের মুক্তি সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্কের একটি সূক্ষ্ম দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বন্দী বিনিময় চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য উভয় পক্ষকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বন্দীদের হস্তান্তর সম্পন্ন করতে হবে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থা এই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য তত্ত্বাবধান করবে এবং কোনো লঙ্ঘন হলে তা দ্রুত রিপোর্ট করবে। এছাড়া, বন্দী হস্তান্তরের পর পুনর্বাসন এবং মানসিক সহায়তার জন্য মানবিক সংস্থাগুলোর সমন্বিত কাজের প্রয়োজন হবে।
এই চুক্তি ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত। ২০১৪ সালে হুথি গোষ্ঠী সরকারী রাজধানী সানা দখল করার পর থেকে দেশটি ধারাবাহিক সংঘাতে নিমজ্জিত হয়েছে, যেখানে হাজারো মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ মানবিক সংকটে ভুগছে। বন্দী মুক্তি চুক্তি এই সংঘাতের মানবিক দিককে কিছুটা হালকা করার লক্ষ্যে গৃহীত হয়েছে।
আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ভূমিকা এই চুক্তির সফলতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। ওমানের মধ্যস্থতা, সৌদি আরবের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের সমর্থন একত্রে চুক্তির বাস্তবায়নকে সহজতর করবে। বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্কের সূক্ষ্মতা বিবেচনা করে, বন্দী বিনিময়ের শর্তাবলী দু’পক্ষের কূটনৈতিক সমঝোতার ফলাফল।
চুক্তির পরবর্তী ধাপ হিসেবে উভয় পক্ষকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বন্দীর হস্তান্তর সম্পন্ন করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের তত্ত্বাবধানে প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ রাখতে হবে। এছাড়া, বন্দী মুক্তির পর পুনর্বাসন, চিকিৎসা এবং মানসিক সহায়তার জন্য স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। এই সব পদক্ষেপ একত্রে ইয়েমেনের মানবিক পরিস্থিতি উন্নত করতে এবং দীর্ঘমেয়াদী শান্তি প্রক্রিয়ার ভিত্তি গড়তে সহায়তা করবে।
সংক্ষেপে, ইয়েমেন সরকার ও হুথি গোষ্ঠীর মধ্যে বন্দী বিনিময় চুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক অগ্রগতি, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে সফলভাবে বাস্তবায়িত হতে পারে। এই চুক্তি ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর শান্তি আলোচনার জন্য একটি ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে কাজ করতে পারে।



