২২ ডিসেম্বর, ঢাকা সুপ্রিম কোর্টের বার‑এ ‘সাধারণ আইনজীবী সমাজ’ ব্যানারের অধীনে এক বৃহৎ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশের মূল উদ্দেশ্য ছিল আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের সাম্প্রতিক বিচার বিভাগ সংক্রান্ত মন্তব্যের ওপর বিরোধ প্রকাশ করা। উপস্থিত আইনজীবীরা আদালত ও বিচার বিভাগের স্বতন্ত্রতা রক্ষার জন্য উপদেষ্টাকে অনধিকৃত মন্তব্য থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানায়।
সমাবেশের সূচনায় সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন আইন উপদেষ্টার প্রতি সম্মানসূচক স্বীকৃতি জানিয়ে, বিচার বিভাগের বর্তমান স্বতন্ত্র অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, বিচার বিভাগ এখন নির্বাহী শাখা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং এর জন্য স্বতন্ত্র সচিবালয় গঠন করা হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে তিনি উপদেষ্টাকে অনুরোধ করেন যে, ভবিষ্যতে বিচার সংক্রান্ত কোনো মন্তব্য করার সময় অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করুন।
খোকনের বক্তব্যের পর, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট গাজী কামরুল সজল আইন উপদেষ্টার একটি নির্দিষ্ট মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন। সজল জানান, সম্প্রতি প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে ড. আসিফ সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন যে তিনি উচ্চ আদালত থেকে জামিন কম দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি এই মন্তব্যকে আদালতের মর্যাদার অবমাননা এবং বিচার বিভাগের ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করে, তৎক্ষণাৎ পুনরায় বিবেচনা ও প্রত্যাহারের দাবি তোলেন।
সমাবেশে শহীদ ওসমান হাদির হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার সম্পর্কেও আলোচনা হয়। খোকন জোর দিয়ে বলেন, হত্যাকারীরা আকাশে বা মাটির নিচে যেখানেই লুকিয়ে থাকুক না কেন, তাদের সনাক্ত করে ন্যায়বিচারের সামনে আনতে হবে। এই বক্তব্যের মাধ্যমে উপস্থিত আইনজীবীরা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা পুনর্ব্যক্ত করেন।
সমাবেশের পরিচালনা অ্যাডভোকেট সামসুল ইসলাম মুকুলের তত্ত্বাবধানে হয় এবং এতে সুপ্রিম কোর্ট বারের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহফুজুর রহমান মিলন, ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির মঞ্জু, অ্যাডভোকেট আব্দুল লতিফ এবং অ্যাডভোকেট মাকসুদ উল্লাহ সহ বহু বিশিষ্ট আইনজীবীর অংশগ্রহণ ছিল। প্রত্যেকেই বিচার বিভাগের স্বতন্ত্রতা রক্ষার জন্য একমত প্রকাশ করেন।
সমাবেশের সময় উল্লেখ করা হয় যে, আইন উপদেষ্টার মন্তব্যের ফলে বিচারিক স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতার ওপর প্রশ্ন তোলা হয়েছে। উপস্থিত আইনজীবীরা একত্রে দাবি করেন যে, ভবিষ্যতে কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা উপদেষ্টা বিচার সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে মন্তব্য করার আগে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করবেন এবং আদালতের স্বায়ত্তশাসনকে ক্ষুণ্ন না করবেন।
এই প্রতিবাদ সমাবেশের পর, আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের অফিসিয়াল মন্তব্যের কোনো পরিবর্তন বা পুনরায় বিবেচনা করা হবে কিনা তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে আইনজীবী সমিতিগুলোর একতাবদ্ধ অবস্থান এবং তাদের চাহিদা সরকার ও বিচার বিভাগ উভয়ের কাছেই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, এই ধরনের সমাবেশ বিচারিক স্বায়ত্তশাসন রক্ষার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হতে পারে এবং ভবিষ্যতে সরকারি নীতি ও আইন উপদেষ্টার ভূমিকা নিয়ে আলোচনা বাড়তে পারে। এছাড়া, বিচার বিভাগের স্বতন্ত্রতা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো ও নীতিমালা পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।
সমাবেশের শেষে উপস্থিত আইনজীবীরা একত্রে একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেন, যেখানে তারা আদালতের মর্যাদা রক্ষার জন্য সকল সরকারি কর্মকর্তাকে অনুরোধ করেন যে, বিচার সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে মন্তব্য করার আগে যথাযথ পরামর্শ ও অনুমোদন নেবেন। এই বিবৃতি ভবিষ্যতে কোনো অনধিকৃত মন্তব্যের পুনরাবৃত্তি রোধে একটি রেফারেন্স হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে, সুপ্রিম কোর্টে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশ আইন উপদেষ্টার মন্তব্যের ওপর একটি স্পষ্ট প্রতিবাদ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে এবং এটি বিচারিক স্বায়ত্তশাসনের প্রতি জনসাধারণের উচ্চ প্রত্যাশা ও নজরদারির প্রতিফলন। ভবিষ্যতে এই ধরনের সমাবেশের প্রভাব কী হবে তা সময়ই নির্ধারণ করবে, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আইনজীবী সম্প্রদায়ের একতাবদ্ধতা স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়।



