মঙ্গলবার রাশিয়া ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সমন্বিত আক্রমণ চালায়, যার ফলে কমপক্ষে তিনজনের প্রাণহানি হয় এবং দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহে জরুরি কাটছাঁট আরম্ভ করা হয়। এই আক্রমণগুলো সংঘাতের সমাপ্তি নিয়ে চলমান আন্তর্জাতিক আলোচনার মাঝামাঝি ঘটেছে।
ঝিটোমির অঞ্চলে চার বছর বয়সী একটি শিশুর মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে, পাশাপাশি কিয়েভ অঞ্চলের এক নারী ও খমেলনিত্সকি অঞ্চলের আরেকজন নাগরিকের প্রাণও চলে যায়। মৃতদের পরিবারগুলো শোকের মধ্যে রয়েছে এবং স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা দ্রুত শোকবিধি চালু করেছে।
উক্রেনের রাষ্ট্রপতি জেলেনস্কি এই ঘটনার পর সামাজিক মাধ্যমে জানিয়েছেন যে এই হামলা যুদ্ধ সমাপ্তির আলোচনার সময়ে রাশিয়ার অগ্রাধিকারকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে। তিনি পশ্চিমা মিত্রদের রাশিয়ার উপর চাপ বাড়াতে আহ্বান জানিয়েছেন।
রাশিয়া এখনও কোনো মন্তব্য করেনি এবং ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ইউক্রেনে সামরিক হস্তক্ষেপের পর থেকে বেসামরিক নাগরিককে লক্ষ্যবস্তু করে না বলে দাবি করে।
উক্রেনের বিদ্যুৎ অপারেটর উক্রেনারগো মঙ্গলবার জানিয়েছে যে বিশাল পরিমাণের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আক্রমণ বহু অঞ্চলে অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি করেছে, ফলে শীতের তীব্র শীতলতা এবং শূন্যের কাছাকাছি তাপমাত্রার মধ্যে জরুরি বিদ্যুৎ কাটছাঁট আরম্ভ করতে বাধ্য হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী ইউলিয়া স্বিরিদেনকো উল্লেখ করেছেন যে দেশের পশ্চিমাঞ্চলীয় অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে, যেখানে এক রাতের মধ্যে শতাধিক ড্রোন এবং কয়েক ডজন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। এই অঞ্চলগুলোতে বিদ্যুৎ গ্রিডের মূল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাপ সরবরাহে বড় ধাক্কা লেগেছে।
উক্রেনের বিমানবাহিনী জানিয়েছে যে সকাল ০৬:২০ GMT সময়ে প্রায় পুরো দেশ জুড়ে বায়ু সতর্কতা সক্রিয় ছিল। রাশিয়া শীতকালে বিদ্যুৎ ও তাপ সরবরাহ ব্যাহত করে ইউক্রেনের লজিস্টিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে দুর্বল করার কৌশল অব্যাহত রেখেছে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন যে শীতের তীব্রতা এবং তাপমাত্রা শূন্যের নিচে নামার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ ঘাটতি জনসংখ্যার দৈনন্দিন জীবনে বড় প্রভাব ফেলবে, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় যেখানে বিকল্প জ্বালানি সরবরাহ সীমিত।
কিয়েভের মেয়র ভিটালি ক্লিচকো জানান যে স্ভিয়াতোশিনস্কি জেলায় একটি আবাসিক ভবনের কাছে ধ্বংসাবশেষ পড়ে জানালাগুলো ভেঙে গেছে। যদিও কোনো আঘাতের রিপোর্ট নেই, তবে স্থানীয় বাসিন্দারা আতঙ্কে ভুগছেন।
ব্ল্যাক সি তীরের ওডেসা শহরে ড্রোন আক্রমণের ফলে অগ্নিকাণ্ড ঘটলেও কোনো মানবিক ক্ষতি রেকর্ড করা যায়নি। জরুরি সেবা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিভিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে।
পোল্যান্ড, যা ন্যাটোর সদস্য, মঙ্গলবার রাশিয়ার আক্রমণ পশ্চিম ইউক্রেনের সীমান্তের নিকটে পৌঁছানোর পর তার আকাশ রক্ষা করার জন্য পোলিশ ও মিত্রবাহিনীর বিমান মোতায়েন করেছে। পোল্যান্ডের রক্ষা ব্যবস্থা প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নাটোরের শীর্ষ কমান্ডার রাশিয়ার শীতকালীন আক্রমণকে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও তাপ সরবরাহে সরাসরি হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে, এবং সদস্য দেশগুলোকে সমন্বিত প্রতিক্রিয়া জানাতে আহ্বান জানিয়েছেন।
উক্রেনের বিদ্যুৎ সংস্থা জরুরি অবস্থায় গ্রাহকদের অল্প সময়ের জন্য বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা চালু করেছে, যাতে সমগ্র নেটওয়ার্কের স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। এই পদক্ষেপে প্রভাবিত হবে শিল্প ও গৃহস্থালী উভয়ই।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা রাশিয়ার এই কৌশলকে শীতের সময়ে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষমতা হ্রাসের একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন, যা ইউক্রেনের জ্বালানি নিরাপত্তা ও জনসাধারণের মনোবলকে দুর্বল করতে লক্ষ্যবস্তু। তারা যুক্তি দেন যে এই ধরনের আক্রমণ ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিরাপত্তা নীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করছে।
শীতের তীব্রতা এবং বিদ্যুৎ ঘাটতির ফলে ইউক্রেনের মানবিক সংকট বাড়তে পারে, তাই আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ও মানবিক সাহায্য গোষ্ঠী দ্রুত সহায়তা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সঙ্গে, রাশিয়ার সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক আলোচনার ফলাফল ভবিষ্যতে এই ধরনের আক্রমণের পরিমাণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



