ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অফ কংগো (DRC) এর পূর্বাঞ্চলে M23 বিদ্রোহী গোষ্ঠী পুনরায় আক্রমণ চালিয়ে উভিরা শহরকে সাময়িকভাবে দখল করে, যা গত মাসে কাতার-সহায়তায় স্বাক্ষরিত শান্তি চুক্তির বাস্তবায়নে নতুন বাধা সৃষ্টি করেছে। এই ঘটনা ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে কাতার রাজধানী দোহায় স্বাক্ষরিত চুক্তির পরই ঘটেছে, যখন উভয় পক্ষই স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও দীর্ঘমেয়াদী শান্তির আশায় ছিল।
M23 গোষ্ঠীকে যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ রুয়ান্ডার সমর্থনকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ২০২১ সালের শেষ থেকে গোষ্ঠীটি কংগোলীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে একাধিক তীব্র সংঘাতে লিপ্ত হয়েছে, যার ফলে এই বছরেই কমপক্ষে ৭,০০০ জনের মৃত্যু ঘটেছে। পূর্বে বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক সমঝোতার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, তবে দোহায় অনুষ্ঠিত আলোচনার পর চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে সাময়িক আশার সঞ্চার হয়।
চুক্তি স্বাক্ষরের পরেও M23 গোষ্ঠী নভেম্বরের শেষের দিকে উভিরা শহরে আক্রমণ চালায় এবং কয়েক দিন ধরে শহরের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র দখল করে রাখে। যুক্তরাষ্ট্রের চাপের ফলে গোষ্ঠীটি শেষ পর্যন্ত শহরটি ত্যাগ করে, যা তারা “বিশ্বাস গড়ার পদক্ষেপ” হিসেবে উপস্থাপন করে। উভিরা দক্ষিণ কিভু প্রদেশের অন্যতম প্রধান পরিবহন ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র, যা লেক তাঙ্গানিকা ও রুয়ান্ডা সীমান্তের নিকটে অবস্থিত, তাই এর কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম।
শান্তি চুক্তির বাস্তবায়নে ধীরগতি নিয়ে কংগোলীয় আইনজীবী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হুবার্ট মাসোমেরা মন্তব্য করেন, “সংঘাতের সমাপ্তির ইচ্ছা স্পষ্টভাবে অনুপস্থিত। মৃত্যুর সংখ্যা ও ধ্বংসের পরিমাণ সত্ত্বেও চুক্তি বাস্তবায়ন ও যুদ্ধবিরতি মেনে চলার ক্ষেত্রে দেরি হচ্ছে। জনগণ নিজেকে পরিত্যক্ত অনুভব করছে।” তিনি গোমা শহরে, যা বর্তমানে M23 নিয়ন্ত্রণে, এই উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
অঞ্চলীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দেন যে, বর্তমান সংঘাতের ধারাবাহিকতা কংগোর প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে উত্তেজনা বাড়াতে পারে। অতীতের দুইটি গৃহযুদ্ধই প্রতিবেশী দেশের হস্তক্ষেপের ফলে তীব্রতর হয়েছিল। রুয়ান্ডা ও উগান্ডার সীমান্তে চলমান সামরিক গতি-প্রকৃতি, পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক চাপ, এই সংঘাতকে আঞ্চলিক মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে।
কাতার, যা শান্তি চুক্তির মধ্যস্থতাকারী, এখন পুনরায় কংগোলীয় সরকার ও M23-র সঙ্গে সমঝোতার অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে উদ্যোগ নিচ্ছে। কাতার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, চুক্তির মূল ধারাগুলি, বিশেষ করে যুদ্ধবিরতি ও শরণার্থীদের পুনর্বাসন, দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত পর্যবেক্ষণ দল পাঠানো হবে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র বিভাগও কংগোতে মানবিক সহায়তা ও নিরাপত্তা সহায়তা বাড়ানোর পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে।
দক্ষিণ কিভু প্রদেশের স্থানীয় প্রশাসন উভিরা শহরের পুনরুদ্ধার ও অবকাঠামো মেরামতের জন্য জরুরি তহবিলের আবেদন করেছে। তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে পুনরায় শুরু করা কঠিন বলে অনুমান করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা গুলোও শরণার্থীদের জন্য অস্থায়ী শিবির স্থাপন ও মৌলিক সেবা প্রদান করতে প্রস্তুত রয়েছে।
শান্তি চুক্তির পরবর্তী মাইলস্টোন হিসেবে, দোহায় স্বাক্ষরিত চুক্তির ধারা অনুযায়ী ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি ও শরণার্থীদের স্বেচ্ছাসেবী পুনর্বাসন পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে বর্তমান আক্রমণ ও পুনরায় দখল এই সময়সূচি ব্যাহত করেছে। বিশ্লেষকরা জোর দিয়ে বলছেন যে, চুক্তির কার্যকরী পর্যবেক্ষণ ও উভয় পক্ষের স্বচ্ছতা ছাড়া কোনো স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
কংগোলীয় সরকার ও M23 গোষ্ঠীকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপের মুখে দ্রুত চুক্তির মূল বিষয়গুলো মেনে চলতে হবে, নতুবা সংঘাতের পরিধি বাড়িয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও মানবিক সংকটের মাত্রা বৃদ্ধি পাবে। বর্তমান পরিস্থিতি কংগোকে আবারও যুদ্ধের ছায়ায় ফেলতে পারে, যা দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও মানবিক উন্নয়নের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।



