ঢাকা শহরে ডেঙ্গু রোগের তীব্রতা আবার শিরোনাম দখল করেছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশে মোট ১১০,৭৬৫ রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং এ বছরের মধ্যে ৪০৯ জনের মৃত্যু ঘটেছে। এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে সতর্কতা বাড়াতে আহ্বান জানিয়েছে।
শহরের বিভিন্ন পরিবারে এই রোগের প্রভাব স্পষ্ট। এক পরিবারে পাঁচ বছর বয়সী শিশুরা এবং ছয় বছর বয়সী নাতি-নাতনিরা সাম্প্রতিককালে একটি কল্পনাপ্রসূত খেলায় ডায়াগনস্টিক সেন্টারের রিসেপশনিস্ট ও রোগীর ভূমিকায় অভিনয় করছিল। তারা টোকেন নম্বর ডেকে, কল্পিত ইনজেকশন নেওয়ার অভিনয় করছিল। এই খেলাটি তাদের হাস্যরসের মাধ্যমে রোগের ভয়কে সাময়িকভাবে দূর করেছিল।
বছরের শুরুর দিকে একই পরিবারে দুইটি গুরুতর রোগের সম্মুখীন হওয়া শিশুদের কথা উল্লেখযোগ্য। বড় সন্তান ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে উচ্চ জ্বর ও রক্তক্ষরণে ভুগে, দীর্ঘ সময় হাসপাতালে ভর্তি ছিল। অন্য সন্তান চিকেনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে তীব্র পেশী ব্যথা ও জ্বরের শিকার হয়। উভয়ই বহু রক্ত পরীক্ষা ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিদর্শনের পর সুস্থ হয়ে ফিরে এসেছে।
ডেঙ্গু ও চিকেনগুনিয়া রোগের পুনরাবৃত্তি রোগীর শারীরিক ও মানসিক চাপ বাড়ায়। বিশেষ করে ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে রোগের বিস্তার দ্রুত হয়, ফলে পরিবারগুলোকে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সঠিক চিকিৎসা গ্রহণে মনোযোগ দিতে হয়।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, ডেঙ্গু রোগের ঝুঁকি কমাতে মশা নিয়ন্ত্রণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য। গৃহে মশার breeding site দূর করা, মশা দংশন প্রতিরোধে মশারী জাল ব্যবহার এবং প্রয়োজনীয় সময়ে ডেঙ্গু টিকাদান করা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
ঢাকার বাসিন্দারা কঠিন পরিস্থিতিতে হাস্যরসকে মানসিক সমর্থন হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন। সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের পরও মানুষ রসিকতা করে পরিস্থিতি হালকা করার চেষ্টা করে, যা মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক। এই ধরনের রসিকতা রোগের বাস্তবতা অস্বীকার করে না, বরং জীবনের সঙ্গে লড়াই করার একটি উপায় হিসেবে কাজ করে।
ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাবের সময় পরিবারগুলোকে রোগের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। উচ্চ জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, পিঠে ব্যথা, ত্বকে র্যাশ বা রক্তক্ষরণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা কেন্দ্রে যোগাযোগ করা উচিত। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না পেলে রোগের জটিলতা বাড়তে পারে।
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, ডেঙ্গু ভাইরাসের বিভিন্ন স্ট্রেইন একে অপরের সঙ্গে মিশে নতুন রূপ নিতে পারে, ফলে রোগের তীব্রতা বাড়ে। তাই স্বাস্থ্য বিভাগ নিয়মিত ভাইরাসের জেনেটিক বিশ্লেষণ করে উপযুক্ত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
ঢাকার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সম্প্রতি ডেঙ্গু রোডম্যাপ প্রকাশ করেছে, যেখানে মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য পেস্টিসাইড স্প্রে, লার্ভিসাইড ব্যবহার এবং জনসচেতনতা ক্যাম্পেইন অন্তর্ভুক্ত। এই উদ্যোগের লক্ষ্য রোগীর সংখ্যা কমিয়ে মৃত্যুহার হ্রাস করা।
গৃহস্থালিতে মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য পরিষ্কার পানির ট্যাঙ্ক, ড্রেন ও গাছের পাত্রে পানি জমে না রাখার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া দরকার। এছাড়া, মশা দংশন প্রতিরোধে লম্বা হাতা ও প্যান্ট পরা, মশা নিরোধক ক্রিম ব্যবহার করা উচিত।
শিশুদের ক্ষেত্রে ডেঙ্গু ও চিকেনগুনিয়া রোগের ঝুঁকি বেশি, তাই পিতামাতা তাদের স্বাস্থ্যের প্রতি অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষা, সঠিক পুষ্টি এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম রোগ প্রতিরোধে সহায়ক।
সামগ্রিকভাবে, ঢাকায় ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে মোকাবিলা করতে সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। সরকার, স্বাস্থ্য সংস্থা এবং নাগরিকদের যৌথ দায়িত্বে মশা নিয়ন্ত্রণ, রোগের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ নিশ্চিত করা যায়। আপনার পরিবারে যদি কোনো সন্দেহজনক উপসর্গ দেখা দেয়, অবিলম্বে নিকটস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে পরামর্শ নিন।



