ফিফের সভাপতি জিয়ানি ইনফ্যান্টিনো ২০২৮ সাল থেকে আফ্রিকা কাপ অফ নেশনস (আফকন) প্রতিটি দুই বছর না হয়ে চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত হবে বলে ঘোষণা করেছেন। এই সিদ্ধান্ত রাবাতের একটি সেমিনারে CAF-এর নির্বাহী কমিটির সদস্য ও লিবেরিয়ার প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়েহা সহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সামনে উপস্থাপিত হয়। ইনফ্যান্টিনো উল্লেখ করেন, এই পরিবর্তন আফ্রিকান ফুটবলের আন্তর্জাতিক মর্যাদা বাড়াবে এবং বাণিজ্যিক দিক থেকে অধিক লাভজনক হবে।
ইনফ্যান্টিনো এই পরিকল্পনা উপস্থাপনের সময় আফ্রিকান ফুটবলের অবকাঠামো উন্নয়ন, রেফারিং মানোন্নয়ন এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “এই দিনটি বিশেষ, এটি আফ্রিকান ফুটবলের নতুন অধ্যায়ের সূচনা।” তিনি আফ্রিকান ফুটবলের সম্ভাবনা বিশ্বকে দেখানোর আহ্বান জানান।
এই পরিবর্তনটি ইউরোপীয় লিগের মৌসুমের মাঝখানে অনুষ্ঠিত হওয়া আফকনের সময়সূচি সমস্যাকে কমাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে আফকন ইউরোপীয় ক্লাবের মৌসুমের সঙ্গে সংঘর্ষে ছিল, যা ক্লাব ও খেলোয়াড়দের জন্য সমন্বয় সমস্যার সৃষ্টি করত। এখন চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত হলে প্রিমিয়ার লিগের কোচ ও স্পোর্টিং ডিরেক্টরদের জন্য এটি স্বাগত হতে পারে।
তবে আফ্রিকান ফুটবল ফেডারেশন (CAF) এর কিছু সদস্য এই পরিবর্তনকে আর্থিক ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন। আফকন থেকে CAF-এর মোট আয়ের প্রায় ৮০% অর্জিত হয়, এবং দুই বছরের চক্রে টুর্নামেন্টের ঘনত্বই এই আয়ের মূল উৎস। চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত হলে টুর্নামেন্টের আয় কমে যাবে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
CAF-এর প্রেসিডেন্ট প্যাট্রিস মোতসেপে, ফিফের জেনারেল সেক্রেটারি ম্যাটিয়াস গ্রাফস্ট্রোমের সঙ্গে দাঁড়িয়ে এই পরিকল্পনা নিশ্চিত করেন। যদিও ২০২১ সালে তিনি ইনফ্যান্টিনোর সঙ্গে মতবিরোধ প্রকাশ করে বলেছিলেন যে “আমরা এই পরিবর্তনকে সমর্থন করি না”, তবু এখন তিনি নতুন চক্রের বাস্তবায়নকে স্বীকার করেছেন। মোতসেপের মতে, এই পরিবর্তন আফ্রিকান ফুটবলের আন্তর্জাতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করবে, তবে আর্থিক প্রভাব মোকাবিলার জন্য CAFকে বিকল্প আয় উৎস অনুসন্ধান করতে হবে।
ইনফ্যান্টিনোর প্রস্তাবের পেছনে বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে আফ্রিকান ফুটবলের বাজারকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার ইচ্ছা রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, চার বছর পরপর টুর্নামেন্টের মাধ্যমে স্পনসরশিপ, টেলিভিশন অধিকার এবং পর্যটন আয় বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে, টুর্নামেন্টের প্রস্তুতি ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
অন্যদিকে, আফ্রিকান দেশগুলোর মধ্যে টুর্নামেন্টের ঘনত্ব কমে যাওয়ায় স্থানীয় ক্লাব ও খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রকাশের সুযোগ কমে যাবে বলে উদ্বেগ দেখা দেয়। বিশেষ করে ছোট দেশগুলো টুর্নামেন্টের মাধ্যমে অর্জিত আর্থিক সহায়তা ও মিডিয়া কভারেজের ওপর নির্ভরশীল। তাই তারা নতুন আয় মডেল, যেমন ক্লাব স্তরের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ও যুব টুর্নামেন্টের সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।
আফকনের পরবর্তী সংস্করণ ২০২৪ সালে মরক্কোতে অনুষ্ঠিত হবে, এবং এই সংস্করণে ইনফ্যান্টিনোর পরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। রাবাতের সেমিনারে উপস্থিত সকল পক্ষ এই পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেন। যদিও কিছু দেশ এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানায়, অন্যদিকে বেশ কয়েকটি ফেডারেশন আর্থিক ক্ষতি ও প্রতিযোগিতার মান হ্রাসের সম্ভাবনা নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করে।
ইনফ্যান্টিনোর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আফকনের সময়সূচি ইউরোপীয় লিগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, যা ক্লাব ও খেলোয়াড়দের জন্য মৌসুমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সহায়ক হবে। তবে CAFকে আর্থিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য বিকল্প আয় উৎস তৈরি করতে হবে, যাতে আফ্রিকান ফুটবলের উন্নয়ন ও টুর্নামেন্টের গুণগত মান বজায় থাকে।
সারসংক্ষেপে, ২০২৮ সাল থেকে আফকন চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত হবে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে সুবিধা এনে দেবে, তবে আফ্রিকান ফেডারেশনগুলোকে আর্থিক ও প্রতিযোগিতামূলক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য নতুন কৌশল গড়ে তুলতে হবে। এই পরিবর্তন আফ্রিকান ফুটবলের ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হতে পারে, এবং এর সাফল্য নির্ভর করবে ফিফ, CAF এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টার ওপর।



