ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ানি ইনফ্যান্টিনো রাবাতের একটি সেমিনারে আফ্রিকান ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। কনফেডারেশন অব আফ্রিকান ফুটবল (CAF) এর নির্বাহী কমিটি, সাবেক ব্যালন ডি’অর জর্জ ওয়াহসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব উপস্থিত ছিলেন। ইনফ্যান্টিনো ২০২৮ সাল থেকে আফ্রিকা কাপ অফ নেশনস (AFCON) দুই বছর পরপর না করে চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত হবে বলে পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন।
সেমিনারটি ফেব্রুয়ারি ২০২০ থেকে চলমান আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে আফ্রিকান ফুটবলের প্রতিযোগিতা ও অবকাঠামো উন্নয়নের ব্যাপক কৌশল উপস্থাপিত হয়। ইনফ্যান্টিনো রেফারিং মান উন্নয়ন, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং কন্টিনেন্টের সামগ্রিক ফুটবল মানোন্নয়নের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তার পাশাপাশি তিনি বর্তমান দুই-বছরের চক্রকে “অপ্রয়োজনীয়” বলে উল্লেখ করে, চার-বছরের চক্রকে বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে অধিক উপকারী বলে যুক্তি দেন।
ইনফ্যান্টিনো বলেন, “এটি আফ্রিকান ফুটবলের জন্য একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। বিশ্বকে দেখাতে হবে আমরা কী করতে পারি।” তিনি জোর দিয়ে বলেন যে দীর্ঘমেয়াদী চক্রের মাধ্যমে আফ্রিকান দলগুলোকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও দৃশ্যমান করা সম্ভব হবে এবং ক্লাব স্তরের মৌসুমের সঙ্গে সংঘর্ষ কমবে। এই পরিবর্তন ইউরোপীয় লিগ, বিশেষত প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলোকে স্বাগত জানাবে বলে ধারণা করা হয়।
তবে আফ্রিকান ফুটবল সংস্থাগুলো এই সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। AFCON ঐতিহ্যগতভাবে CAF এর মোট আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ সরবরাহ করে, যা দেশের ফুটবল উন্নয়ন ও অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য মূল তহবিল। চার-বছরের চক্রে এই আয় হ্রাস পেলে অনেক ফেডারেশন আর্থিক সংকটে পড়তে পারে বলে সতর্কতা দেওয়া হয়েছে।
CAF এর সভাপতি প্যাট্রিস মটসেপে রাবাতের সেমিনারে ইনফ্যান্টিনোর পরিকল্পনা নিশ্চিত করেন। তিনি ফিফার সাধারণ সম্পাদক ম্যাটিয়াস গ্রাফস্ট্রোমের সঙ্গে দাঁড়িয়ে নতুন চক্রের ঘোষণা দেন, যদিও ২০২১ সালে তিনি ইনফ্যান্টিনোর সঙ্গে মতবিরোধ প্রকাশ করে বলেছিলেন যে “আমরা এই পরিবর্তনকে সমর্থন করি না”। এই পরিবর্তনের পেছনে মূল কারণ হিসেবে তিনি বাণিজ্যিক স্বার্থ ও আন্তর্জাতিক দৃশ্যমানতা উল্লেখ করেন।
ইনফ্যান্টিনোর এই পদক্ষেপের ফলে ইউরোপীয় ক্লাবের মৌসুমের মাঝখানে AFCON অনুষ্ঠিত হওয়া থেকে রেহাই পাবে, যা পূর্বে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্লাব ও জাতীয় দলগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রিমিয়ার লিগের কোচ ও স্পোর্টিং ডিরেক্টররা এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানিয়েছেন, কারণ এতে তাদের দলগুলোর মৌসুমে ব্যাঘাত কমবে।
অন্যদিকে, আফ্রিকান ফেডারেশনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করে যে, কম ফ্রিকোয়েন্সি মানে টুর্নামেন্টের টেলিভিশন ও স্পনসরশিপ আয় হ্রাস পাবে। AFCON এর ঐতিহাসিক জনপ্রিয়তা ও বাণিজ্যিক আকর্ষণকে বিবেচনা করে, এই আয় হ্রাস সরাসরি দেশের ফুটবল উন্নয়ন প্রকল্পে প্রভাব ফেলতে পারে।
ইতিহাসিকভাবে, AFCON থেকে অর্জিত আয় CAF এর অবকাঠামো নির্মাণ, প্রশিক্ষণ ক্যাম্প এবং যুব উন্নয়ন প্রোগ্রামের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। চার-বছরের চক্রে এই তহবিলের ধারাবাহিকতা নষ্ট হলে, অনেক দেশ দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে।
সেমিনারের পর, মটসেপে ও গ্রাফস্ট্রোমের যৌথ বিবৃতি প্রকাশ পায়, যেখানে তারা নতুন চক্রের বাস্তবায়নকে “আফ্রিকান ফুটবলের ভবিষ্যৎ গড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ” বলে উল্লেখ করেন। তারা জোর দিয়ে বলেন যে, এই পরিবর্তনটি কন্টিনেন্টের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় প্রতিযোগিতামূলকতা বাড়াবে এবং ক্লাব ও জাতীয় দলের সময়সূচি সমন্বয়কে সহজ করবে।
ইনফ্যান্টিনোর পরিকল্পনা নিয়ে কিছু বিশ্লেষক রাজনৈতিক স্বার্থের টানাপোড়েনের ইঙ্গিত দিয়েছেন, যেখানে ফিফা কন্টিনেন্টাল ফেডারেশনগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তার করছে বলে অভিযোগ উঠে। তবে ফিফা এই সিদ্ধান্তকে কেবল ফুটবলের গ্লোবাল উন্নয়নের দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণ করেছে বলে দাবি করে।
AFCON ২০২৪ মরক্কোতে শেষ হওয়ার পর, নতুন চক্রের কার্যকরীতা এবং তার আর্থিক প্রভাবের মূল্যায়ন করা হবে। আফ্রিকান ফেডারেশনগুলো এখন থেকে এই পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নেওয়ার জন্য কৌশল তৈরি করছে, যাতে তারা আর্থিক ক্ষতি কমিয়ে ফুটবলের গুণগত মান বজায় রাখতে পারে। ভবিষ্যতে এই চক্রের সফলতা নির্ভর করবে ফিফা ও CAF এর সমন্বিত কাজের ওপর, এবং কন্টিনেন্টের দেশগুলো কীভাবে নতুন বাণিজ্যিক মডেল গ্রহণ করবে তার ওপর।



