১৯৭৫ সালে উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনাম একত্রিত হওয়ার পর, নতুন সরকার বেসরকারি শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে জাতীয়করণ করে। এই নীতি অর্থনৈতিক কাঠামোকে ব্যাহত করে, উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং দেশীয় বাজারে ঘাটতি দেখা দেয়। ফলস্বরূপ, ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকে দেশটি তীব্র মন্দার মুখোমুখি হয়।
জাতীয়করণের পরবর্তী বছরগুলোতে মুদ্রাস্ফীতি শীর্ষে পৌঁছায়; বার্ষিক হার ৪৫৪ শতাংশের কাছাকাছি রেকর্ড করা হয়। তীব্র মূল্যবৃদ্ধি এবং খাদ্য সংকটের ফলে জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি মানুষ দারিদ্র্যের সীমার নিচে নেমে যায়। এই অর্থনৈতিক চাপ সরকারকে পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করে, এবং ১৯৮৬ সালে ব্যাপক অর্থনৈতিক সংস্কার চালু করা হয়।
সেই সংস্কারকে স্থানীয় ভাষায় ‘দয় ময়’ বলা হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিল বাজারকে উন্মুক্ত করা এবং বিদেশি বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করা। সরকার কর ছাড়, শুল্ক হ্রাস এবং বিনিয়োগের জন্য বিশেষ অঞ্চল স্থাপনসহ বিভিন্ন প্রণোদনা প্রদান করে। এই নীতিমালা দ্রুতই আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক দৃষ্টিতে ভিয়েতনামকে আকর্ষণীয় করে তুলতে শুরু করে।
বহিরাগত মূলধনের প্রবাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের জিডিপি গড়ে ৬ শতাংশের গড় বার্ষিক বৃদ্ধির হার বজায় রাখে। বিশেষ করে গত পনেরো বছর ধরে এই গতি স্থিতিশীল থাকে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যের শক্তিশালী সূচক। ২০২৪ সালে ভিয়েতনামের মোট দেশীয় উৎপাদন প্রায় ৪৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছায়, যার মধ্যে রপ্তানি থেকে প্রাপ্ত আয় ৯৩ শতাংশেরও বেশি।
জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৫ সালে দেশীয় ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত রপ্তানি মাত্র ৫.৪৫ বিলিয়ন ডলার ছিল। এরপর প্রতি পাঁচ বছরে রপ্তানি পরিমাণ দ্বিগুণ বা তার বেশি বৃদ্ধি পায়। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে রপ্তানি মোট ৪০০ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে, যা ত্রিশ বছরের মধ্যে ৭৩ গুণ বৃদ্ধির সমান।
প্রাথমিকভাবে বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগের (এফডিআই) প্রবেশ গেট ছিল গার্মেন্টস শিল্প। তুলনামূলকভাবে কম শ্রমিক খরচের সুবিধা নিয়ে নাইকি, অ্যাডিডাস ইত্যাদি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড দেশীয় কারখানা স্থাপন করে। এই শিল্পের দ্রুত বিকাশ স্থানীয় কর্মসংস্থান বাড়ায় এবং রপ্তানি আয়ের ভিত্তি গড়ে তোলে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভিয়েতনাম ইলেকট্রনিক্স উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায়। স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ক্যামেরা এবং অন্যান্য উচ্চ প্রযুক্তি পণ্যের উৎপাদন বাড়ার ফলে দক্ষ কর্মীর চাহিদা তীব্রতর হয়। ফলে দেশীয় ও বিদেশি তরুণ প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের জন্য শহরগুলোতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
শহরাঞ্চলে প্রযুক্তি-ভিত্তিক স্টার্টআপ এবং গবেষণা কেন্দ্রের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, যা মানবসম্পদ উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। হ্যানয় এবং হো চি মিন সিটিতে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে ওঠে, যেখানে ইলেকট্রনিক্স ও সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টে দক্ষতা অর্জন করা যায়। এই প্রবণতা দেশের রপ্তানি পণ্যের গুণগত মানকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলেছে।
বর্তমানে ভিয়েতনামের শীর্ষ রপ্তানি পণ্য হল ইলেকট্রনিক্স, যার মোট রপ্তানি মূল্য ২০২৩ সালে ১৩৪ বিলিয়ন ডলার রেকর্ড করেছে। যদিও ইলেকট্রনিক্স ও গার্মেন্টস এখনও প্রধান সেক্টর, তবে রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ছে; কৃষি পণ্য, জ্বালানি, যন্ত্রপাতি এবং রসায়ন শিল্পের পণ্যও উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করে। এই বৈচিত্র্য রপ্তানি বাজারের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক।
বহিরাগত বিনিয়োগের প্রবাহের ফলে ভিয়েতনামের শিল্প কাঠামো দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। গার্মেন্টস থেকে ইলেকট্রনিক্সে রূপান্তর উৎপাদন শৃঙ্খলকে উচ্চ মানের দিকে নিয়ে গেছে এবং মূল্য সংযোজনের হার বাড়িয়েছে। ফলে দেশীয় কোম্পানিগুলোও আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনে অংশ নিতে সক্ষম হয়েছে।
বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার জন্য সরকার অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে চলেছে; নতুন বন্দর, বিমানবন্দর এবং লজিস্টিক হাব গড়ে তোলার মাধ্যমে রপ্তানি খরচ কমানো হচ্ছে। একই সঙ্গে, কর নীতি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোকে স্বচ্ছ করে বিদেশি অংশীদারদের আস্থা জোরদার করা হচ্ছে। এই পদক্ষেপগুলো দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, ভিয়েতনামের রপ্তানি বৃদ্ধির গতি মূলত বৈশ্বিক চাহিদা এবং দেশীয় উৎপাদন দক্ষতার সমন্বয়ে ঘটছে। তবে, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের অস্থিরতা, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং মুদ্রা পরিবর্তনের ঝুঁকি ভবিষ্যতে রপ্তানি আয়কে প্রভাবিত করতে পারে। তাই, সরকারকে রপ্তানি পণ্যের গুণগত মান বজায় রেখে নতুন বাজার অনুসন্ধানে সক্রিয় থাকতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদে ভিয়েতনামের অর্থনৈতিক নীতি আরও উচ্চ প্রযুক্তি ও পরিষেবা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকে ঝুঁকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গবেষণা ও উন্নয়ন (আর অ্যান্ড ডি) তে সরকারি সহায়তা বৃদ্ধি পাবে, যাতে দেশীয় উদ্ভাবন ক্ষমতা শক্তিশালী হয়। এই কৌশল রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দেশকে এগিয়ে রাখবে।
সারসংক্ষেপে, ১৯৮৬ সালের দয় ময় সংস্কার থেকে ভিয়েতনাম রপ্তানি ও বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য মডেল হিসেবে উদ্ভাসিত হয়েছে। গার্মেন্টস থেকে ইলেকট্রনিক্সে রূপান্তর, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং মানবসম্পদে বিনিয়োগের সমন্বয়ই দেশের অর্থনৈতিক উত্থানের মূল চালিকাশক্তি। ভবিষ্যতে বৈশ্বিক বাজারের পরিবর্তন এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে নীতি নির্ধারণে নমনীয়তা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ হবে।



