চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান সোমবারের ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন যে, জাপান পারমাণবিক অস্ত্রের দিকে ঝুঁকলে এশিয়া‑প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিপন্ন হবে এবং যুদ্ধোত্তর আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলাকে চ্যালেঞ্জ করবে। তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, এই ধরনের অবস্থান বিশ্বব্যাপী অ‑বিস্তার ব্যবস্থার জন্য সরাসরি হুমকি।
ব্রিফিংয়ে লিন জিয়ান জাপানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক প্রকাশ্য মন্তব্যের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, তারা স্পষ্টভাবে দাবি করছেন যে জাপানের পারমাণবিক অস্ত্র থাকা উচিত। এই বক্তব্যগুলো জাপানের ঐতিহ্যবাহী অ‑পারমাণবিক নীতির সঙ্গে বিরোধপূর্ণ, যা বহু দশক ধরে দেশের নিরাপত্তা কৌশলের মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী সম্প্রতি দেশের অ‑পারমাণবিক নীতি পুনঃপর্যালোচনা করার এবং সকল সম্ভাব্য বিকল্প টেবিলে রাখার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, ভবিষ্যতে নিরাপত্তা পরিবেশের পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে পারমাণবিক অস্ত্রসহ সব বিকল্প বিবেচনা করা হবে। এই ঘোষণাটি জাপানের নিরাপত্তা কৌশলে সম্ভাব্য রূপান্তরের ইঙ্গিত দেয়।
চীন এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা এবং পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (NPT) লঙ্ঘনের স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে দেখছে। লিন জিয়ান উল্লেখ করেছেন যে, জাপানের এই নতুন অবস্থান আন্তর্জাতিক অ‑বিস্তার ব্যবস্থার মৌলিক নীতিগুলোকে দুর্বল করবে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোকে অস্থিতিশীল করে তুলবে।
ব্রিফিংয়ে লিন জিয়ান ২০২৪ সালের ৮০তম বার্ষিকীকে উল্লেখ করে বলেছেন, এই সময়ে জাপানের ডানপন্থী শক্তিগুলোর পারমাণবিক অস্ত্রের আলোচনা জাতীয় পুনর্সামরিকীকরণের দিকে অগ্রসর হওয়ার সংকেত দেয়। তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল পুনর্বিবেচনার প্রচেষ্টা এই ধরনের রেডিক্যাল নীতি গঠনে প্রভাব ফেলছে।
বেইজিং বিশ্বাস করে যে, কাল্পনিক হুমকির কথা তুলে ধরে পারমাণবিক অ‑বিস্তার চুক্তিকে দুর্বল করা জাপানের জন্য অগ্রহণযোগ্য। লিন জিয়ান উল্লেখ করেছেন, কোনো দেশই কল্পিত হুমকি ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা ভাঙতে পারে না, বিশেষ করে যখন তা বৈশ্বিক অ‑বিস্তার কাঠামোর ভিত্তি ক্ষুণ্ণ করে।
চীনের এই সতর্কতা আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিবেশে নতুন উত্তেজনা যোগ করেছে, বিশেষ করে চীন-জাপান সম্পর্কের ঐতিহাসিক উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জাপানের কৌশলগত অংশীদারিত্বের প্রেক্ষিতে। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এই বিবৃতি চীনের ইচ্ছা প্রকাশ করে যে, পারমাণবিক অস্ত্রের প্রসারকে রোধে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে, যদিও এটি দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান কূটনৈতিক সংলাপকে জটিল করতে পারে।
জাপানের সরকার এখনো চীনের মন্তব্যের প্রতি কোনো সরকারি প্রতিক্রিয়া জানায়নি, তবে পারমাণবিক নীতি পর্যালোচনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এই প্রক্রিয়ার ফলাফল ভবিষ্যতে জাপানের নিরাপত্তা কৌশলে কী পরিবর্তন আনবে তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন, পারমাণবিক অস্ত্রের সম্ভাব্য গ্রহণ জাপানের নিরাপত্তা নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারে এবং এশিয়া‑প্রশান্ত মহাসাগরীয় নিরাপত্তা কাঠামোতে নতুন সমন্বয় প্রয়োজন হবে। এ ধরনের পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে জাপানের কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে।
আসন্ন কূটনৈতিক আলোচনায় এই বিষয়টি কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে উঠে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। জাপান ও চীন উভয়ই পারস্পরিক নিরাপত্তা উদ্বেগের সমাধানে দ্বিপাক্ষিক সংলাপের দরজা খোলা রেখেছে, তবে পারমাণবিক নীতি নিয়ে মতবিরোধ উভয় দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে টানটান করতে পারে।
অবশেষে, আন্তর্জাতিক অ‑বিস্তার সংস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রধান শক্তিগুলোও জাপানের নীতি পরিবর্তনের দিকে ঘনিষ্ঠ নজর রাখবে। পারমাণবিক অস্ত্রের সম্ভাব্য গ্রহণ কেবল জাপান নয়, পুরো এশিয়া‑প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ভারসাম্যকে পুনর্গঠন করতে পারে, তাই ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক পদক্ষেপগুলোতে সতর্কতা ও সমন্বয় প্রয়োজন হবে।



