বগুড়া জেলার একটি গ্রামে ১২ বছর বয়সী বাক্ ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী কিশোরীকে তার চাচাতো ভাই বহুবার যৌন নির্যাতনের শিকার হতে দেখা গেছে। প্রথম ঘটনার পর পরিবারিক সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান করা হয়। একই বছরেই একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটার পর, কিশোরীর পরিবার আইনি পদক্ষেপ নিতে চায়, তবে চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ের শর্তে মামলাটি ত্যাগ করে। শেষ পর্যন্ত কিশোরীকে চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে বিবাহ করা হয় না, তবে তার বাবা-মা ২৫,০০০ টাকার নগদে মামলাটি বন্ধ করে দেয়।
এই ঘটনা বগুড়া অঞ্চলের প্রতিবন্ধী কিশোরীদের মধ্যে একা না, বরং দেশের বহু শিশুর জন্যই সাধারণ হয়ে উঠেছে; আইনজীবী ও শিশু অধিকার কর্মীরা জানান, শিশুর ওপর যৌন নির্যাতনের বেশিরভাগই আপস‑মীমাংসা, সাক্ষী সুরক্ষার অভাব এবং মামলার দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ার কারণে আদালতে পৌঁছায় না।
জাতীয় মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থা ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মোট ৯৬৩টি শিশু নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে, যার অর্থ প্রতিদিন গড়ে তিনটি শিশুর ওপর নির্যাতন ঘটছে। একই সময়সীমায় গত বছর ৬৩১টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছিল, ফলে এক বছরের মধ্যে নির্যাতনের সংখ্যা ৫২ শতাংশ বেড়েছে। বিশেষ করে যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের ক্ষেত্রে ২০২৫ সালে ৪৩২টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যা গত বছরের ২৩৪টির তুলনায় ৮৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
শিশু নির্যাতনের ধরনগুলোর মধ্যে ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, শারীরিক নির্যাতন এবং যৌন নির্যাতন সর্বাধিক প্রচলিত। মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম এগারো মাসে মোট ৩৮৭টি শিশুর মৃত্যু ঘটেছে, যার জন্য ২৯১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। ছয় বছর বয়সের নিচে ৯২টি, এবং বারো বছর বয়সের নিচে ৯১টি শিশুর মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর সংখ্যা ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সের কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে দেখা গেছে।
শিশা অধিকার সংস্থার প্রধান নির্বাহী জিনাত আরা হক উল্লেখ করেন, “মামলা চলাকালীন শিশুর বিয়ে হয়ে যাওয়া, পরিবারের সামাজিক চাপ এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে ভুক্তভোগীর পরিবার আইনি লড়াই ত্যাগ করে।” তিনি আরও বলেন, “সাক্ষী সুরক্ষার কোনো আইন না থাকলে, ভুক্তভোগী ও তার পরিবারকে ঝুঁকিতে ফেলা হয়, ফলে তারা প্রায়ই অর্থের বিনিময়ে মামলাটি বন্ধ করে দেয়।”
একজন সাবেক পিপি অ্যাডভোকেট রিয়াজ উদ্দিনও একই দৃষ্টিভঙ্গি শেয়ার করেন। তিনি বলেন, “বেশিরভাগ সময় নির্যাতনের পর পরিবার ভুক্তভোগীকে অন্য বাড়িতে স্থানান্তর করে, যাতে সাক্ষী পাওয়া কঠিন হয়। আর কখনও কখনও অভিভাবকরা অর্থের বিনিময়ে মামলা ত্যাগ করে, অথবা পুরোপুরি মামলা না করার সিদ্ধান্ত নেয়।”
এই ধরনের সমঝোতা ও মামলাবিহীন সমাধান কেবল ভুক্তভোগীর জন্যই নয়, পুরো সমাজের জন্যই ক্ষতিকর। কারণ অপরাধীর অপরাধমূলক দায়িত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি আবার একই রকম অপরাধ করতে পারেন। তদুপরি, সাক্ষী সুরক্ষার অভাবে আইনি ব্যবস্থা কার্যকর হয় না, ফলে অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বগুড়া জেলায় এই কিশোরীর ঘটনা তদন্তের দায়িত্বে থাকা স্থানীয় পুলিশ এখনো মামলার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। তারা জানিয়েছে, প্রমাণ সংগ্রহ এবং সাক্ষী সুরক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনা রোধ করা যায়। একই সঙ্গে, মানবাধিকার সংস্থা ও শিশু অধিকার কর্মীরা আদালতে সাক্ষী সুরক্ষার জন্য আইন প্রণয়নের দাবি জানাচ্ছেন, যাতে ভুক্তভোগী ও তার পরিবারকে সুরক্ষিত রাখা যায়।
শিশু নির্যাতনের ঘটনা বাড়তে থাকায়, সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জন্য জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে—দ্রুত এবং কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা, যাতে শিশুরা নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী শিশুরা, যাদের সুরক্ষার জন্য বিশেষ মনোযোগের প্রয়োজন, তাদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
শিশু নির্যাতনের পরিসংখ্যানের ধারাবাহিক বৃদ্ধি এবং মামলাবিহীন সমঝোতার প্রবণতা থেকে স্পষ্ট যে, বর্তমান আইনগত কাঠামো ও সুরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতি সমস্যার মূল কারণ। তাই, আইন প্রণয়নকারী সংস্থা, মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থা এবং সিভিল সোসাইটি সংগঠনগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
বগুড়া জেলার এই কিশোরীর ঘটনা, যদিও একটি নির্দিষ্ট ঘটনার উদাহরণ, তবু এটি পুরো দেশের শিশু নির্যাতনের একটি বৃহৎ চিত্রের অংশ। সঠিক নীতি, যথাযথ সুরক্ষা এবং দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়া, শিশুরা নিরাপদে বড় হতে পারবে না।
এখন পর্যন্ত, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি, তবে ভবিষ্যতে সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রণয়ন এবং শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।



