পায়রাবন্দ গ্রামাঞ্চলে শিশিবিবাহের ঘটনা এখনও ব্যাপক, যেখানে কোহিনুর নামের এক নারীকে সাত বছর বয়সে বিয়ে করা হয়। ৭ ডিসেম্বর তার পরিবারে গিয়ে দেখা যায়, তিনি এখন ৪০ বছর বয়সী, তিনটি সন্তানসহ স্বামী শাহীদুল ইসলামের সঙ্গে কৃষিকাজ ও গরু-পশু পালন করেন। তার জীবনের গল্প শিশিবিবাহের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ও শিক্ষার ঘাটতি উন্মোচন করে।
পায়রাবন্দের প্রতিটি মৌজা ও গ্রামে শিশিবিবাহের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে; সাত বছর আগে করা জরিপে শখানেক বয়সের মেয়ে ও ছেলেদের বিয়ের সংখ্যা প্রকাশ পেয়েছিল। ১৯৯২ সালের মার্চে ত্রিশেকের বেশি ঘটনা নথিভুক্ত হয়, যার মধ্যে কোহিনুর ও শাহীদুলের বিয়ের কাহিনী বিশেষ দৃষ্টিগোচর। স্থানীয় নারী অধিকার কর্মী রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের জন্মস্থানও এই গ্রাম, যেখানে শিশিবিবাহ, অসম বিবাহ, যৌন নির্যাতন ইত্যাদি সামাজিক সমস্যার ওপর প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
কোহিনুরের বিয়ে সাত বছর বয়সে হয়, তখন তিনি পায়রাবন্দ প্রাইমারি স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ছিলেন। বিয়ে হওয়ার পর তার শিক্ষা বাধাগ্রস্ত হয়; শ্বশুরবাড়ির লোকজনের অবহেলা ও সামাজিক চাপের ফলে তিনি বিদ্যালয় ছেড়ে দেন। তবু তিনি ছোটবেলায় তার মা আছিরন নেছার কাছ থেকে পাটজাত পণ্য তৈরির দক্ষতা শিখে, পরে স্থানীয় প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করেন।
বর্তমানে কোহিনুরের স্বামী শাহীদুল কৃষিকাজের পাশাপাশি রিকশা চালান, আর কোহিনুর তিনটি সন্তানকে বড় করছেন। তিনি নিজের কাজের পাশাপাশি স্থানীয় ‘অনেক আশা মহিলা কুটির শিল্প মহিলা সমিতি’তে প্রশিক্ষণ ও পণ্য প্রদর্শনীতে অংশ নেন। তবে তিনি জানান, প্রশিক্ষক পদে আবেদন করার সময় শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ চাওয়া হয়, যা না থাকায় কাজ পেতে বাধা পান। “আমি আটকে গেছি শিক্ষার একটি সার্টিফিকেটের জন্য,” তিনি বলেন, যা তার পেশাগত উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করছে।
কোহিনুরের অভিজ্ঞতা শিশিবিবাহের পরিণতি ও শিক্ষার গুরুত্বের স্পষ্ট উদাহরণ। বিয়ে হওয়ার পর তার স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া, কিন্তু শ্বশুরবাড়ির লোকজনের অবজ্ঞা ও সামাজিক বাধা তাকে বাধা দেয়। তার মা যদিও সমর্থন করলেও, ছোটবেলায় বিয়ে হওয়া তার শিক্ষার ধারাবাহিকতা নষ্ট করে। এই ধরনের বাধা গ্রামাঞ্চলের বহু মেয়ের জন্য সাধারণ, যেখানে শিক্ষার সুযোগ সীমিত এবং সামাজিক রীতি এখনও পুরনো।
শিক্ষা বিভাগে দেখা যায়, শিশিবিবাহের ফলে মেয়েদের শিক্ষাগত অর্জন কমে যায়, যা তাদের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ও সামাজিক অবস্থানকে প্রভাবিত করে। কোহিনুরের মতো নারীরা প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা অর্জন করে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করলেও, সরকারি নীতি ও প্রকল্পের যোগ্যতা শর্ত তাদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই শিক্ষার পাশাপাশি দক্ষতা প্রশিক্ষণ ও সনদ প্রদান সহজ করা জরুরি।
পায়রাবন্দের এই বাস্তব উদাহরণ থেকে স্পষ্ট যে, শিশিবিবাহের দমন এবং শিক্ষার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা একসাথে করা প্রয়োজন। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, সরকারী দপ্তর ও নারী সংগঠনগুলোকে একত্রে কাজ করে বয়সসীমা রক্ষা, শিক্ষার সাপোর্ট ও দক্ষতা প্রশিক্ষণকে সমন্বিত করতে হবে।
শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের দৃষ্টিকোণ থেকে, শিশিবিবাহের শিকার নারীদের জন্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পাশাপাশি পেশাগত প্রশিক্ষণ সনদ সহজলভ্য করা জরুরি। এই ধরনের নীতি বাস্তবায়ন হলে কোহিনুরের মতো নারীরা তাদের স্বপ্নের পথে অগ্রসর হতে পারবে।
আপনার এলাকায় যদি শিশিবিবাহের ঘটনা থাকে, তবে স্থানীয় শিক্ষা অফিস ও নারী অধিকার সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ করে তৎক্ষণাৎ হস্তক্ষেপের ব্যবস্থা করুন। শিক্ষার সঠিক পথে চালিয়ে যাওয়া এবং দক্ষতা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা ভবিষ্যতে স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করার মূল চাবিকাঠি।



