ঢাকা—আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (ICDDR,B) ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) যৌথভাবে আয়োজন করা এক সেমিনারে দেশের আত্মহত্যা সংক্রান্ত সাম্প্রতিক তথ্য উপস্থাপন করা হয়। সেমিনারে অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ক্রাইম) মো. আশরাফুল ইসলাম ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত আত্মহত্যা‑সংক্রান্ত রেকর্ডের বিশ্লেষণ শেয়ার করেন।
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে মোট ৭৩,৫৯৭ জন ব্যক্তি আত্মহত্যা করেছেন, যার ফলে বার্ষিক গড় সংখ্যা প্রায় ১৪,৭১৯ জন। এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে প্রতিদিন গড়ে ৪০টি আত্মহত্যা ঘটছে বলে অনুমান করা যায়। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১২,৩৩৫টি আত্মহত্যা রেকর্ড করা হয়েছে, যা দৈনিক গড়কে প্রায় ৪১টি পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়।
পদ্ধতিগত দিক থেকে গলা ফাঁস (হ্যাংিং) সর্বাধিক প্রচলিত পদ্ধতি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আত্মহত্যার পদ্ধতি ও ঘটনার ঘনত্বের বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, গলা ফাঁসের মাধ্যমে আত্মহত্যা দেশের মোট আত্মহত্যা ঘটনার একটি বড় অংশ গঠন করে।
আঞ্চলিকভাবে যশোর জেলা সর্বোচ্চ আত্মহত্যা ঘটনার হার ধারণ করে। অন্যান্য জেলার তুলনায় যশোরে আত্মহত্যা সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি, যা স্থানীয় মানসিক স্বাস্থ্য সেবার ঘাটতি ও সামাজিক চাপের ইঙ্গিত দিতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২১ সালের অনুমান অনুযায়ী বাংলাদেশে মোট ৪,৭১৪টি আত্মহত্যা ঘটেছে, যা প্রতি ১ লক্ষ মানুষের মধ্যে ২.৮টি আত্মহত্যা হিসেবে প্রকাশ পায়। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ বুলেটিন একই বছরে প্রতি ১ লক্ষ মানুষের মধ্যে ৮.৬৮টি আত্মহত্যা রিপোর্ট করেছে, যা WHO‑এর অনুমানের চেয়ে ত্রিগুণ বেশি। পুলিশ বিভাগও WHO‑এর অনুমানের চেয়ে বাস্তব সংখ্যা বেশি বলে জানায় এবং আত্মহত্যা‑সংক্রান্ত তথ্য তাদের রেজিস্টারে সংরক্ষিত রয়েছে।
এই তথ্যগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে, আত্মহত্যা প্রতিরোধে একক সংস্থা বা মন্ত্রণালয়ের প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়। স্বাস্থ্য, কৃষি, স্বরাষ্ট্র, শিক্ষা, ধর্ম, তথ্য ও যোগাযোগ ইত্যাদি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সমন্বিত কাজ প্রয়োজন। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মো. মাহবুবুর রহমানের মতে, মানসিক স্বাস্থ্য সেবা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাথমিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে আত্মহত্যা হ্রাস করা সম্ভব।
সেমিনারে উল্লেখ করা হয়, আত্মহত্যা‑সংক্রান্ত তথ্যের সঠিক রেকর্ড ও বিশ্লেষণ নীতি নির্ধারণের ভিত্তি। অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক আশরাফুল ইসলাম ২০২০‑২০২৪ সালের ডেটা এবং ২০২৫ সালের প্রথম দশ মাসের ডেটা উপস্থাপন করে দেখিয়েছেন, কীভাবে সময়ের সাথে আত্মহত্যা হার পরিবর্তিত হচ্ছে।
অধিকন্তু, ফেসবুকের মতো সামাজিক মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার করে আত্মহত্যা প্রতিরোধে গবেষণা চালু করা হয়েছে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হল অনলাইন আচরণ বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের সনাক্ত করা এবং দ্রুত মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা প্রদান করা।
সামগ্রিকভাবে, আত্মহত্যা একটি জটিল সামাজিক ও মানসিক সমস্যা, যার সমাধানে বহুমুখী কৌশল প্রয়োজন। সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টা, মানসিক স্বাস্থ্য সেবার প্রবেশযোগ্যতা বৃদ্ধি এবং জনসচেতনতা ক্যাম্পেইন এই সমস্যার মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পাঠকদের জন্য সুপারিশ করা হচ্ছে, মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি দৃষ্টিপাত বাড়িয়ে আত্মহত্যা‑সংক্রান্ত সংকেতগুলো সময়মতো চিহ্নিত করা। পরিবার ও বন্ধুদের মধ্যে খোলামেলা আলোচনা, পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে জরুরি হেল্পলাইন ব্যবহার করা আত্মহত্যা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে। আত্মহত্যা‑সংক্রান্ত তথ্যের স্বচ্ছতা ও সঠিক রেকর্ড বজায় রাখাও নীতি নির্ধারণে সহায়ক হবে।



