থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিহাসাক ফুয়াংকেতকেও গত সোমবার কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত একটি সংবাদ সম্মেলনে জানালেন যে, থাইল্যান্ড ও কম্বোডার মধ্যে গত অক্টোবর মাসে স্বাক্ষরিত সীমান্ত সংঘাত সমাধানের চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সফরের সঙ্গে যুক্ত চাপের ফলে তাড়াহুড়ো করে সম্পন্ন হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চাহিদা ছিল যে, ট্রাম্পের ভ্রমণের সময়ই উভয় দেশের সরকার একসাথে ঘোষণাপত্র স্বাক্ষর করবে। এ কারণেই থাইল্যান্ডের দল দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে যৌথ ঘোষণার স্বাক্ষরকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
থাইল্যান্ড ও কম্বোডা দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তে সশস্ত্র সংঘাত ও গুলিবিদ্ধের ঝুঁকির মুখে ছিল। গত অক্টোবর মাসে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার লক্ষ্য ছিল সীমান্তে অস্ত্রবিরতি নিশ্চিত করা এবং পারস্পরিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন। তবে, চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই উভয় পক্ষের মধ্যে কিছু শর্তে মতবিরোধ দেখা দেয়, যার ফলে পরের মাসে চুক্তি স্থগিত করা হয়।
সিহাসাক ফুয়াংকেতকেও স্বীকার করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সফরের সময়ে চুক্তি স্বাক্ষর করা ছিল এক ধরনের কূটনৈতিক কৌশল। তিনি বলেন, “আমরা তাড়াহুড়ো করে যৌথ ঘোষণার স্বাক্ষর করেছি, কারণ যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সফরের সময়ই তা সম্পন্ন হোক।” তিনি আরও যোগ করেন যে, ত্বরিত স্বাক্ষর প্রক্রিয়ার ফলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের যথাযথ আলোচনা বাদ পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই উভয় দেশের সরকারগুলোকে কিছু শর্তে পুনরায় আলোচনা করতে হয়। পরের মাসে চুক্তি অস্থায়ীভাবে স্থগিত করা হয়, যা মূলত চুক্তির বাস্তবায়নযোগ্যতা এবং পারস্পরিক স্বার্থের সমন্বয় নিয়ে পুনর্বিবেচনা করার প্রয়োজনীয়তা থেকে উদ্ভূত হয়। এই স্থগিতকরণে উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতা গড়ে তোলার জন্য অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজনীয়তা জোর দেওয়া হয়।
থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তদুপরি উল্লেখ করেন যে, কোনো চুক্তি যত দ্রুত স্বাক্ষর করা হোক না কেন, তা কার্যকর ও সম্মানজনক হতে হলে যথাযথ আলোচনা এবং বাস্তবায়ন পরিকল্পনা অপরিহার্য। তিনি বলেন, “যত তাড়াতাড়ি সম্ভব স্বাক্ষর করা ভাল, তবে কখনও কখনও আমাদের সত্যিই বসে আলোচনা করতে হয়, যাতে আমরা যে বিষয়গুলোতে একমত হই তা সত্যিই কার্যকর হয় এবং সম্মানিত হয়।” এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় যে, থাইল্যান্ড সরকার এখন চুক্তির বাস্তবায়নযোগ্যতা বাড়াতে আরও বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছে।
কম্বোডিয়ার দিক থেকেও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে। যদিও সরকারও যুক্তরাষ্ট্রের চাপের ফলে দ্রুত স্বাক্ষরের দিকে ঝুঁকে গিয়েছিল, তবে পরবর্তীতে তারা স্বীকার করেছে যে, চুক্তির ধারাগুলোকে বাস্তবিকভাবে কার্যকর করার জন্য আরও সময় এবং সমন্বয় প্রয়োজন। উভয় দেশের কূটনীতিকরা এখন পুনরায় আলোচনার মাধ্যমে চুক্তির মূল বিষয়গুলোকে পুনর্বিবেচনা করার চেষ্টা করছে, যাতে সীমান্তে স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করা যায়।
এই ঘটনাটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক গতিবিধিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক চাপের ফলে চুক্তি তাড়াহুড়ো করে স্বাক্ষরিত হওয়ায়, ভবিষ্যতে এই ধরনের আন্তর্জাতিক চাপে দেশীয় স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষা করা কতটা কঠিন হতে পারে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোর জন্য, কূটনৈতিক স্বার্থ রক্ষা এবং জাতীয় স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখার মধ্যে সূক্ষ্ম সমন্বয় বজায় রাখা এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অধিকন্তু, এই চুক্তির তাড়াহুড়ো স্বাক্ষর এবং পরবর্তী স্থগিতকরণ উভয় দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকেও প্রভাবিত করতে পারে। থাইল্যান্ডের সরকারকে এখন এই চুক্তির পুনর্বিবেচনা এবং বাস্তবায়ন পরিকল্পনা নিয়ে দেশের নাগরিকদের কাছে স্পষ্টতা দিতে হবে, যাতে জনমতকে স্থিতিশীল রাখা যায়। একই সময়ে, কম্বোডিয়ার সরকারকে সীমান্তে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখতে হবে।
ভবিষ্যতে উভয় দেশের কূটনৈতিক দলগুলোকে পুনরায় আলোচনা করে চুক্তির মূল শর্তগুলোকে পুনর্গঠন করতে হবে, যাতে তা বাস্তবিকভাবে কার্যকর হয় এবং উভয় পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করে। বিশেষ করে সীমান্তে অস্ত্রবিরতি, সীমান্ত রক্ষার জন্য যৌথ নজরদারি ব্যবস্থা এবং পারস্পরিক নিরাপত্তা সহযোগিতা এই পুনর্গঠনের মূল বিষয় হতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর জোর দেওয়া “বসে আলোচনা করা” পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
অঞ্চলীয় নিরাপত্তা সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলিও এই চুক্তির পুনর্বিবেচনা এবং বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণে সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে। তারা উভয় দেশের মধ্যে সমঝোতা গড়ে তোলার জন্য প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং পর্যবেক্ষণ মেকানিজম সরবরাহ করতে পারে, যাতে চুক্তি বাস্তবে কার্যকর হয় এবং পুনরায় সংঘাতের ঝুঁকি কমে।
সর্বশেষে, থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাড়াতাড়ি স্বাক্ষর করা চুক্তি যদিও আন্তর্জাতিক চাপের ফলে প্রয়োজনীয় হতে পারে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধান দিতে পারে না। তাই, উভয় দেশকে এখন থেকে আরও বিস্তৃত আলোচনা এবং পারস্পরিক স্বার্থের সমন্বয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এই ধাপটি সফল হলে, থাইল্যান্ড‑কম্বোডিয়া সীমান্তে স্থায়ী শান্তি এবং পারস্পরিক বিশ্বাসের ভিত্তি গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।
অবশেষে, পরবর্তী কূটনৈতিক রাউন্ডে উভয় পক্ষের জন্য মূল লক্ষ্য হবে চুক্তির কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা, যাতে সীমান্তে পুনরায় সংঘাতের সম্ভাবনা কমে এবং অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিবেশ উন্নত হয়।



