গত বৃহস্পতিবার, লাওসের হুয়াই শায় থেকে লুয়াং প্রাবাং গন্তব্যে যাত্রা করা একটি ফেরি মেকং নদীর জলে ডুবে ৩১ বছর বয়সী ফরাসি পর্যটক অ্যান্থনি লেভেলু সহ ১৪০‑এর বেশি যাত্রীকে বিপদের মধ্যে ফেলেছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, ফেরিতে মোট ১১৮ জন পর্যটক, ২৯ জন স্থানীয় বাসিন্দা এবং চারজন ক্রু সদস্য ছিলেন, যার মধ্যে তিনজনের পরেও বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
ফেরি হুয়াই শায় গ্রাম থেকে উত্তর লাওসের ঐতিহাসিক শহর লুয়াং প্রাবাং পর্যন্ত নিয়মিত চলা একটি জনপ্রিয় রুট, যা পর্যটকদের মধ্যে বিশেষভাবে জনপ্রিয়। যাত্রা শুরু হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই জাহাজটি নদীর নিচের পাথরে আঘাত করে, ফলে জাহাজের তলায় ছিদ্র হয়ে দ্রুত ডুবে যায়।
আঘাতের পর জাহাজের ক্রু সদস্যরা যথেষ্ট প্রস্তুত না থাকায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় এবং জাহাজের মধ্যে প্যানিকের পরিবেশ তৈরি হয়। লেভেলু উল্লেখ করেন, “যাত্রীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও, লাইফ জ্যাকেটের সংখ্যা মাত্র পনেরোটি, যা নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি প্রকাশ করে।”
ডুবে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীরা কাছাকাছি চলমান একটি ছোট নৌকায় সাহায্য চেয়ে চিৎকার করে, তবে সেই নৌকা থেমে না গিয়ে দূরে সরে যায়। পরের নৌকা থেমে যাত্রীদের তাড়া করে, তবে তার আসন্ন উপস্থিতি জাহাজের ভারসাম্য নষ্ট করে, ফলে জাহাজের এক পাশে অতিরিক্ত ওজন জমে পানির স্তর দ্রুত বাড়ে।
একজন ব্রিটিশ পর্যটক, ২৭ বছর বয়সী, জানান যে, “রেসকিউ নৌকা যখন আমাদের ফেরির কাছে আসে, তখন কিছু মানুষ এক পাশে সরে যায়, ফলে জাহাজের হালকা অংশে অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং জল দ্রুত ভরে যায়।” তিনি নিজেরা ছাদে উঠে রেসকিউ নৌকায় লাফিয়ে ওঠার কথা বর্ণনা করেন।
অনেক যাত্রী ছাদে উঠে রেসকিউ নৌকায় লাফিয়ে ওঠার চেষ্টা করেন, অন্যরা রেলিং ধরে সাঁতার কেটে নিরাপদ স্থানে পৌঁছায়। কিছুজন রেলিংয়ের সাহায্যে উঠে যায়, আবার কিছুজন পানিতে ভেসে রেসকিউ নৌকার দিকে তাড়া করে।
লেভেলু উল্লেখ করেন যে, তিনি ফেরিতে একটি মা এবং তার দুই সন্তানকে দেখেছিলেন, তবে রেসকিউ নৌকে পৌঁছানোর সময় তারা আর দেখা যায়নি। পরের দিন, লাওসের মিডিয়া জানায় যে, প্যানি হের নামের এক নারী দেহ পাওয়া গিয়েছে, তবে তার দুই সন্তান এখনও অনুসন্ধানাধীন।
অধিকাংশ যাত্রী নিরাপদে তীরে পৌঁছায়, তবে তিনজনের অবস্থা অনিশ্চিত রয়ে যায়। রেসকিউ দলের অনুসন্ধান এখনও চালু রয়েছে, এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষ মৃতদেহের সনাক্তকরণ ও অনুপস্থিত শিশুদের সন্ধানে কাজ করছে।
এই দুর্ঘটনা লাওসের পর্যটন শিল্পের জন্য বড় ধাক্কা, কারণ হুয়াই শায় থেকে লুয়াং প্রাবাং পর্যন্ত রুটটি বহু বিদেশি পর্যটকের প্রধান গন্তব্য। সরকার দ্রুত তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং ভবিষ্যতে সমজাতীয় দুর্ঘটনা রোধে লাইফ জ্যাকেটের সংখ্যা বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা জাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ, ক্রু প্রশিক্ষণ এবং নিরাপত্তা সরঞ্জামের যথাযথতা মূল্যায়ন করবে। এছাড়া, মেকং নদীর এই গুরুত্বপূর্ণ রুটে নৌকা চলাচলের জন্য নতুন নিরাপত্তা মানদণ্ড প্রণয়ন করা হবে।
দুর্ঘটনা ঘটার পর আন্তর্জাতিক পর্যটন সংস্থা ও বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে লাওসের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে লাওস সরকার এই উদ্বেগগুলোকে স্বীকার করে, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত তদারকি ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
সারসংক্ষেপে, মেকং নদীর এই ফেরি দুর্ঘটনা একদিকে মানবিক দুঃখের কারণ, অন্যদিকে লাওসের পর্যটন অবকাঠামোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হলে, লাওসের পর্যটন শিল্প পুনরায় সুরক্ষিত ও টেকসইভাবে বিকশিত হতে পারে।



