বাংলাদেশ নভেম্বর ২০২৬-এ সর্বনিম্ন উন্নত দেশ (এলডিসি) ক্লাব থেকে বেরিয়ে আসবে, তবে বাণিজ্যিক সুবিধা হারানোর ঝুঁকি বাড়ার কারণে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে। গার্মেন্টস রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতির জন্য এই পরিবর্তন কেবল প্রতীকী নয়, বরং মূল বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশের অধিকার হারানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে সরকার “স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি” (STS) নামে একটি নীতি রোডম্যাপ চালু করেছে, যা গ্র্যাজুয়েশন শকের প্রভাব কমাতে বাণিজ্যিক সুবিধা সংরক্ষণের লক্ষ্য রাখে। STS-এর অধীনে মূল বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনার তীব্রতা বাড়ানো হয়েছে, তবে দুই দশকের বেশি সময়ের আলোচনার পরও বেশিরভাগ চুক্তি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
অধিকাংশ চুক্তি এখনো কার্যকর হয়নি, ফলে রপ্তানিকারকরা অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ করছেন। কিছু ব্যতিক্রমী চুক্তি ব্যতীত, বাণিজ্যিক শর্তাবলী এখনও চূড়ান্ত রূপ পায়নি, যা রপ্তানি খাতের পরিকল্পনা ও বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করছে।
গতকাল বাংলাদেশ ও জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (EPA) নিয়ে আলোচনার সমাপ্তি ঘোষণা করেছে। চুক্তি স্বাক্ষর ও র্যাটিফিকেশন সম্পন্ন হলে জাপানীয় বাজারে ৭,৩৭৯টি বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশ নিশ্চিত হবে, যার মধ্যে প্রস্তুত গার্মেন্টসও অন্তর্ভুক্ত। একই সঙ্গে জাপান থেকে ১,০৩৯টি পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুবিধা বাংলাদেশ দেবে।
EPA-তে সেবা ক্ষেত্রেও বিস্তৃত ব্যবস্থা রয়েছে; বাংলাদেশ ৯৭টি উপ-সেক্টর ও জাপান ১২০টি উপ-সেক্টর উন্মুক্ত করবে, যা বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের নতুন সুযোগ তৈরি করবে। চুক্তিটি এখন জাপানের সংসদ, ডায়েটের অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করছে, এরপরই কার্যকর হবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে আলাদা EPA নিয়ে আলোচনাও সমাপ্তির কাছাকাছি। বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমানের মতে, স্বাক্ষরের জন্য নিকট ভবিষ্যতে চূড়ান্ত রূপ নেওয়া সম্ভব। এই চুক্তি সফল হলে দু’দেশের মধ্যে শুল্কমুক্ত পণ্য ও সেবা বিনিময় বাড়বে, যা উভয় দেশের রপ্তানি ও বিনিয়োগে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (RCEP), আসিয়ান দেশ, চীন, ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনায় যুক্ত। এসব আলোচনার মূল লক্ষ্য হল শুল্কমুক্ত প্রবেশের শর্তাবলী সুনিশ্চিত করা এবং নতুন বাজারে প্রবেশের পথ প্রশস্ত করা।
বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, গার্মেন্টস শিল্পের রপ্তানি আয় প্রায় ৭০% এই চুক্তিগুলোর ওপর নির্ভরশীল। শুল্কমুক্ত প্রবেশ না পেলে ইউরোপীয় ও উত্তর আমেরিকান বাজারে প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে পড়বে, ফলে রপ্তানি আয় হ্রাসের ঝুঁকি বাড়বে।
অন্যদিকে, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হলে উচ্চ মানের প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের প্রবাহ বাড়বে, যা গার্মেন্টস শিল্পের উৎপাদন দক্ষতা ও মান উন্নয়নে সহায়ক হবে। সেবা ক্ষেত্রের উন্মুক্ততা নতুন স্টার্টআপ ও আইটি সেবা কোম্পানিগুলোর জন্যও বাজার তৈরি করবে।
তবে চুক্তি স্বাক্ষর ও র্যাটিফিকেশন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হতে পারে, যা সময়মতো সুবিধা অর্জনে বাধা হতে পারে। বিশেষ করে জাপানের ডায়েটের অনুমোদন প্রক্রিয়া অনিশ্চিত, ফলে চুক্তির কার্যকর হওয়া ২০২৫ সালের শেষের দিকে বা তার পরেও হতে পারে।
বাণিজ্যিক ঝুঁকি কমাতে সরকারকে দ্রুত চুক্তি চূড়ান্ত করে রপ্তানিকারকদের জন্য শুল্কমুক্ত প্রবেশ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে, রপ্তানি কাঠামো বৈচিত্র্যকরণ ও নতুন পণ্যের উন্নয়নেও মনোযোগ দিতে হবে, যাতে একক বাজারের ওপর নির্ভরতা কমে।
সংক্ষেপে, বাংলাদেশ এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন নিকটে আসার সঙ্গে সঙ্গে বাণিজ্যিক সুবিধা রক্ষার জন্য জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে চুক্তি অগ্রগতি একটি ইতিবাচক সিগন্যাল। তবে অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনার অগ্রগতি ধীর হলে রপ্তানি শিল্পের জন্য শুল্কমুক্ত প্রবেশের ঝুঁকি বাড়বে, যা বাজারের স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগের পরিবেশকে প্রভাবিত করবে।



