গুলশানের র্যাঙ্কন আইকন টাওয়ারের চারটি উচ্চমানের ফ্ল্যাট, যেগুলো সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক বেঞ্জীর আহমেদ ও তার পরিবারের মালিকানাধীন, আদালতের আদেশ ও প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদনে ত্রাণ তহবিলে হস্তান্তর করা হয়েছে। হস্তান্তরের সময় একটি বিশেষ আইনি শর্ত আরোপ করা হয়েছে; সম্পূর্ণ মালামাল একসঙ্গে না দিয়ে, নিলামযোগ্য জিনিসের নমুনা সংরক্ষণ করে অবশিষ্ট অংশ ত্রাণ তহবিলে জমা দিতে হবে।
এই ব্যবস্থা ২২ ডিসেম্বর, সোমবার, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেনের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তিনি জানিয়েছেন যে, আদালতের আদেশের ভিত্তিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দুদককে ১৪ ডিসেম্বর প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে একটি চিঠি পাঠানো হয়, যেখানে উল্লেখ করা হয় যে, বাজেয়াপ্ত জিনিসপত্র সরাসরি ত্রাণ তহবিলে হস্তান্তর করা যাবে না; বরং আইনি বাধ্যবাধকতা হিসেবে নিলামযোগ্য জিনিসের নমুনা সংরক্ষণ করে অবশিষ্ট মালামাল ত্রাণ তহবিলে জমা দিতে হবে।
মহা জ্যেষ্ঠ স্পেশাল জজ আদালত ২৭ অক্টোবর যে আদেশ দিয়েছিলেন, তাতে এই নমুনা সংরক্ষণের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছিল। সেই আদেশের ভিত্তিতে পরবর্তীতে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় একটি প্রশাসনিক নির্দেশনা জারি করে। দুদক আদালতকে জানায় যে, মূলত এই জিনিসপত্র নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হতো, তবে গুলশানের মতো জনবহুল ও নিরাপত্তা সংবেদনশীল উচ্চ-rise ভবনে প্রকাশ্য নিলাম আয়োজন করা কঠিন বলে বিবেচনা করা হয়। এছাড়া নিলামের জন্য দীর্ঘ তালিকা প্রস্তুত ও প্রক্রিয়াকরণের সময় পচনশীল ও নরম জিনিসপত্র নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
কমিশনের সভার সিদ্ধান্ত অনুসারে, দুদক ত্রাণ তহবিলে এই মালামাল জমা দেওয়ার আবেদন করে, যা আদালত মঞ্জুর করে। আদালতের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের নির্দেশে দুদকের সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিটের পরিচালক ও রিসিভারকে এই সম্পদের বিবরণ জানাতে হবে। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দুদক ইতিমধ্যে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে।
দুদকের প্রস্তুত করা সম্পদের তালিকায় দেখা যায়, গুলশানের ফ্ল্যাট নং ১২/এ, ১২/বি, ১৩/এ ও ১৩/বি-তে বিশাল পরিমাণ পোশাক ও গৃহস্থালি সামগ্রী সঞ্চিত ছিল। বিশেষ করে ফ্ল্যাট ১২/এ-এর ড্রয়িং রুমে ৫২টি নতুন শার্ট, ৫২টি নতুন প্যান্ট, ১০২ জোড়া স্যান্ডেল এবং প্রচুর পরিমাণে পাঞ্জাবি ও পায়জামা রাখা ছিল। অন্যান্য ফ্ল্যাটে একই রকম পরিমাণে নতুন জ্যাকেট, ট্রাউজার, স্লিপার, টুপি, হ্যান্ডব্যাগ এবং গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি যেমন ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ ও টেলিভিশন পাওয়া গিয়েছে।
বিলাসবহুল গৃহসজ্জা সামগ্রীগুলোর মধ্যে আধুনিক ডিজাইনের সোফা, ডাইনিং টেবিল, চেয়ার, কার্পেট ও ল্যাম্প অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া রান্নাঘরে উচ্চমানের কুকওয়্যার, চায়ের সেট, গ্লাসওয়্যার ও কাঁচের পাত্রও সঞ্চিত ছিল। দুদকের তালিকায় উল্লেখ আছে যে, কিছু ফ্ল্যাটে অ্যালমারিতে সোনার গহনা ও ঘড়ি সংরক্ষিত ছিল, যদিও সেগুলোর পরিমাণ ও মূল্য স্পষ্ট করা হয়নি।
প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ তহবিলে এই সম্পদ হস্তান্তরের মাধ্যমে, সরকারী ত্রাণ কার্যক্রমে অতিরিক্ত সম্পদ যোগ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তহবিলের ব্যবহারের বিষয়ে পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করা হবে। দুদক গঠন করা কমিটি এই হস্তান্তরের সকল ধাপ তদারকি করবে এবং আইনি শর্ত অনুসারে নমুনা সংরক্ষণ নিশ্চিত করবে।
আসন্ন সময়ে আদালত এই হস্তান্তরের পর্যালোচনা করবে এবং প্রয়োজনে অতিরিক্ত নির্দেশ জারি করতে পারে। দুদক ও প্রধান উপদেষ্টার অফিসের মধ্যে সমন্বয় অব্যাহত থাকবে, যাতে সম্পদের সুষ্ঠু হস্তান্তর ও ত্রাণ তহবিলে সঠিকভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, দুর্নীতি দমন কমিশনের সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিটের কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর লক্ষ্যও রয়েছে।
বেঞ্জীর আহমেদ ও তার পরিবারকে এই সম্পদের মালিকানা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে এবং এখন এই জিনিসপত্র সরকারী ত্রাণ তহবিলে যুক্ত হবে, যা দরিদ্র ও দুর্যোগপ্রবণ জনগোষ্ঠীর সহায়তায় ব্যবহার করা হবে। ভবিষ্যতে আদালত ও দুদক এই ধরনের সম্পদের হস্তান্তরে আরও কঠোর তদারকি বজায় রাখবে বলে আশা করা যায়।



