দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আজ (২২ ডিসেম্বর) ন্যাশনাল ব্যাংকের ৮১৩ কোটি ৭০ লাখ টাকার ঋণ জালিয়াতি ও আত্মসাৎ মামলায় অনুমোদন দিয়েছে। অনুমোদিত মামলায় সিকদার পরিবার, মাইশা গ্রুপের পরিচালক এবং ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অন্তর্ভুক্ত, যাদের বিরুদ্ধে অর্থপাচার, দুর্নীতি ও মানি লন্ডারিং সংক্রান্ত অভিযোগ আনা হয়েছে। দুদকের উপ-পরিচালক আফরোজা হক খান শিগগিরই এই মামলাটি আদালতে দায়ের করবেন।
কমিশনের তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে, ন্যাশনাল ব্যাংকের দিলকুশা শাখা ও প্রধান কার্যালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা ‘মানহা প্রিকাস্ট টেকনোলজি লিঃ’ নামে একটি অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানে বিশাল পরিমাণ ঋণ প্রদান করে। এই প্রতিষ্ঠানটি মূলত ‘স্মার্ট ব্যাটারি টেকনোলজি লিঃ’ নামের একটি কাগুজে প্রতিষ্ঠানের শ্যাডো কোম্পানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। জাল নথিপত্র তৈরি করে ঋণ গ্রহণের পর তা অন্য ব্যবসার দায় মেটাতে এবং পে‑অর্ডারের মাধ্যমে স্থানান্তর করে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে দুদক জানিয়েছে।
সিকদার পরিবারের মধ্যে প্রাক্তন ন্যাশনাল ব্যাংক পরিচালক ও সিকদার গ্রুপের প্রয়াত কর্ণধার জয়নুল হক সিকদারের স্ত্রী মনোয়ারা সিকদার, কন্যা পারভীন হক সিকদার, পুত্র রন হক সিকদার এবং রিক হক সিকদারকে আসামি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পরিবার সদস্যদের পাশাপাশি মাইশা গ্রুপের পরিচালক ও প্রয়াত এমপি আসলামুল হকের স্ত্রী মাকসুদা হককেও মামলায় নাম করা হয়েছে।
ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রাক্তন ব্যবস্থাপনা পরিচালক চৌধুরী মোস্তাক আহমেদ, এম এ ওয়াদুদ এবং প্রাক্তন অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ই এস এম বুলবুলসহ বিভিন্ন স্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়াও মানহা প্রিকাস্ট টেকনোলজির পরিচালক মো. মনসুর আলী ও সিইও সৈয়দ মাহতাব উদ্দিন মাহমুদকে মামলায় যুক্ত করা হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঋণ অনুমোদনের সময় ব্যাংকের তৎকালীন পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ক্ষমতার অপব্যবহার করে শ্যাডো কোম্পানিকে ঋণ প্রদান করে। এই ঋণগুলো প্রকৃত ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ব্যবহার না করে, অন্য প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ঘাটতি পূরণে এবং পে‑অর্ডারের মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় স্থানান্তর করে আত্মসাৎ করা হয়েছে। ফলে ব্যাংকের সম্পদ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং জালিয়াতির পরিমাণ দেশের বৃহত্তম আর্থিক স্ক্যান্ডালগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের প্রাসঙ্গিক ধারা অনুযায়ী অভিযোগ আনা হয়েছে। দুদক উল্লেখ করেছে, জাল নথিপত্রের মাধ্যমে ঋণ গ্রহণ, ঋণকে অবৈধভাবে স্থানান্তর এবং স্বল্পমেয়াদে স্বার্থসিদ্ধির জন্য ব্যবহার করা উভয়ই অপরাধের অন্তর্ভুক্ত।
আফরোজা হক খান দুদকের অনুমোদনের পর শীঘ্রই আদালতে মামলাটি দায়ের করবেন বলে জানিয়েছেন। মামলাটি দায়ের হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি আদেশ, সম্পত্তি জব্দ এবং আর্থিক দায়িত্ব নির্ধারণের জন্য প্রাথমিক শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। আদালত যদি প্রমাণের ভিত্তিতে দোষী সাব্যস্ত করে, তবে সংশ্লিষ্টদের উপর কঠোর শাস্তি আরোপের সম্ভাবনা রয়েছে।
দুদকের এই পদক্ষেপ ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতি দমন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে। ন্যাশনাল ব্যাংকের ঋণ ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণে ত্রুটি প্রকাশের পর, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলি ব্যাংকের শাসন কাঠামো পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যতে এধরনের জালিয়াতি রোধে কঠোর নজরদারি বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে।
এই মামলার ফলাফল ন্যাশনাল ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্যের পুনরুদ্ধার, সংশ্লিষ্ট পরিবার ও ব্যবসা গোষ্ঠীর আইনি দায়িত্ব নির্ধারণ এবং দেশের আর্থিক ব্যবস্থার ওপর বিশ্বাস পুনর্স্থাপন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। দুদক ও সংশ্লিষ্ট আইনগত সংস্থাগুলি পরবর্তী পর্যায়ে তদন্তের অগ্রগতি এবং আদালতের রায়ের ভিত্তিতে অতিরিক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।



