ঢাকা, রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা – দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থা ও বাজেট ব্যয় পর্যালোচনার জন্য আজ প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের তত্ত্বাবধানে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ. মনসুর উপস্থিত ছিলেন। সভায় মুদ্রা, মজুরি, কৃষি, বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ, চলতি হিসাব, প্রবাস আয় এবং শিল্পখাতের ঋণপত্রের অবস্থা সহ বিভিন্ন সূচক বিশদভাবে আলোচনা করা হয়।
বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল মুদ্রাস্ফীতি ও মজুরি বৃদ্ধির পারস্পরিক সম্পর্ক। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মুদ্রাস্ফীতি ও মজুরি বৃদ্ধির হারের মধ্যে পার্থক্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে, যা শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় সহায়ক বলে বিবেচিত হচ্ছে।
কৃষি খাতে, বোরো ধানের ফলন পূর্বের চেয়ে উন্নত হয়েছে বলে জানানো হয়। সরকারী প্রণোদনা ও সঠিক ব্যবস্থাপনার ফলে উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের অনুপস্থিতি কারণে চলতি মৌসুমে আমন ধানের ফলনও সন্তোষজনক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ক্ষেত্রে, ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত রিজার্ভ ৩২.৫৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগস্ট ২০২৪-এ প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। রিজার্ভের এই উন্নতি দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থার সূচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চলতি হিসাবের ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদী ঘাটতির পর ধীরে ধীরে কমে এসেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষে চলতি হিসাবের ঘাটতি মাত্র ১৩৯ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যেখানে জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ঘাটতি ৭৪৯ মিলিয়ন ডলার ছিল। এই পরিবর্তনটি আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব সংগ্রহের কার্যকরী পদক্ষেপের ফলাফল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রবাস আয়ের ক্ষেত্রে, জুলাই-নভেম্বর সময়কালে ৫ লক্ষ কর্মীর বৈদেশিক নিয়োগ নিশ্চিত হয়েছে, যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই সময়ে ৩.৯৭ লক্ষ কর্মীর তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে প্রবাস আয় ১৩.০৪ বিলিয়ন ডলার হয়েছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ১৭.১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রবৃদ্ধি দেশের মুদ্রা প্রবাহ ও বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চয়ের জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
শিল্পখাতে ঋণপত্রের ব্যবহারেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির জন্য ঋণপত্রের হার বৃদ্ধি পেয়েছে, যা শিল্প উৎপাদন বাড়াতে এবং বিনিয়োগের পরিবেশকে উন্নত করতে সহায়তা করবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এটিকে দেশের অর্থনীতিতে আস্থা ফিরে আসার সূচক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বৈঠকের অংশগ্রহণকারীরা জোর দিয়ে বলেছেন যে আর্থিক শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনা জোরদার করার ফলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার হচ্ছে। তারা ভবিষ্যতে মুদ্রা নীতি, বাজেট ব্যয় এবং বিনিয়োগের দিক থেকে আরও কড়া নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন।
সামগ্রিকভাবে, বৈঠকে উপস্থাপিত তথ্যগুলো দেশের অর্থনৈতিক সূচকের ভারসাম্যহীনতা কাটিয়ে ওঠার দিকে অগ্রগতি নির্দেশ করে। মুদ্রা, কৃষি, বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ, চলতি হিসাব, প্রবাস আয় এবং শিল্পখাতের উন্নতি একসঙ্গে দেশের আর্থিক স্বাস্থ্যের পুনর্গঠনকে সমর্থন করবে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন যে যদিও বর্তমান অগ্রগতি ইতিবাচক, তবে মুদ্রাস্ফীতি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্ভাব্য ঝুঁকি ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণে সতর্কতা বজায় রাখতে হবে। তাই, আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রেখে ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ ও সমন্বয় প্রয়োজন হবে।



