ঢাকা, সোমবার – অর্থবছরের শেষ পর্যন্ত সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতি সাত শতাংশের নিচে নামবে বলে সরকারী উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা আজ একত্রিত হয়ে জানিয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে মুদ্রানীতি ও কৃষি প্রণোদনা দুটোই মূল চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বৈঠকে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ. মনসুর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় উপস্থিত ছিলেন। সকল অংশগ্রহণকারী দেশীয় অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও বাজেটের বর্তমান অবস্থা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেন।
বৈঠকের সমাপ্তিতে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। এতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গত বছর জুনের পর থেকে প্রথমবার নভেম্বর মাসে ১২ মাসের গড়ে মুদ্রাস্ফীতি নয় শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এটি জুন ২০২৩ থেকে ধারাবাহিকভাবে রেকর্ড করা সর্বনিম্ন মান।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, সঙ্কোচনমূলক মুদ্রানীতি এবং কৃচ্ছ্রসাধনের ফলস্বরূপ জুন ২০২৬ পর্যন্ত মুদ্রাস্ফীতি সাত শতাংশের নিচে নামবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার সমন্বয় এবং বাজারে তরলতা নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
বাংলাদেশ ব্যুরো অফ স্ট্যাটিস্টিক্স (বিবিএস) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর মাসে সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতি গত বছরের একই মাসের তুলনায় ৮.২৯ শতাংশে পৌঁছেছে, যা অক্টোবরের ৮.১৭ শতাংশের তুলনায় সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বৃদ্ধির প্রধান কারণ খাদ্যপণ্যের দামের উত্থান।
খাদ্যসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী, অক্টোবরের ৭.০৮ শতাংশ থেকে নভেম্বরের ৭.৩৬ শতাংশে খাদ্যসামগ্রীর মুদ্রাস্ফীতি বেড়েছে। যদিও এই বৃদ্ধি ধীরগতিতে ঘটেছে, তবু ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতায় প্রভাব ফেলছে।
অন্যদিকে, খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দামের পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়ে গেছে। অক্টোবর মাসে এই সেক্টরের মুদ্রাস্ফীতি ৯.১৩ শতাংশ ছিল, যা নভেম্বরের ৯.০৮ শতাংশে সামান্য কমেছে। এই সূচকটি নির্দেশ করে যে, মূলধারার পণ্যদ্রব্যের দাম তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।
মুদ্রাস্ফীতির ধারাবাহিকতা সাধারণ জনগণের জীবনে চাপ বাড়িয়ে তুলেছে, তবে বেতন বৃদ্ধির হার এখনও প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। বৈঠকে বেতন বৃদ্ধির বিষয়ও আলোচনার অংশ ছিল এবং বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, পূর্ববর্তী বছরগুলোতে মুদ্রাস্ফীতি ও বেতন বৃদ্ধির মধ্যে বড় পার্থক্য ছিল, যার ফলে বাস্তব আয় হ্রাস পেয়েছে। তবে চলতি অর্থবছরের সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই পার্থক্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে, যা বাস্তব আয়ের পুনরুদ্ধারের সূচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সরকারি দপ্তর আরও জানিয়েছে, বাস্তব আয় ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাবে এবং ভবিষ্যতে মুদ্রাস্ফীতি ও বেতন বৃদ্ধির সমন্বয় আরও সুসংহত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার লক্ষ্যকে সমর্থন করে।
কৃষি খাতে যথাযথ প্রণোদনা ও ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে বোরো মৌসুমে ধানের ফলন উন্নত হয়েছে। সরকার এই সাফল্যকে কৃষকদের উৎসাহিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের নীতি চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, মুদ্রাস্ফীতি লক্ষ্য অর্জনের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সমন্বয় এবং কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর ধারাবাহিকতা অপরিহার্য। তবে আন্তর্জাতিক পণ্যের দামের ওঠানামা এবং জ্বালানি খরচের পরিবর্তন দেশীয় মুদ্রাস্ফীতির উপর প্রভাব ফেলতে পারে, তাই নীতি নির্ধারকদের সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।



