দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কনসুলার ও ভিসা সেবা আজ থেকে অস্থায়ীভাবে বন্ধ করা হয়েছে। সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে শনিবার রাতে হাইকমিশনের সামনে চরমপন্থী সংগঠন ‘অখণ্ড হিন্দু রাষ্ট্রসেনা’ এর ২০-২৫ জন সদস্যের বিক্ষোভের পর, যেখানে তারা বাংলাদেশকে লক্ষ্য করে স্লোগান শোনায় এবং হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহকে সরাসরি হুমকি জানায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা এ বিষয়ে স্পষ্টতা প্রদান করে বলেন, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সেবা বন্ধ থাকবে।
বিক্ষোভটি শনিবার রাতের প্রায় বিশ মিনিট স্থায়ী ছিল। অংশগ্রহণকারীরা হাইকমিশনের সামনে একত্রিত হয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক তীব্র ভাষা ব্যবহার করে প্রতিবাদ করে। তাদের মূল দাবি ছিল বাংলাদেশ সরকারের নীতি ও কার্যক্রমের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করা, এবং হাইকমিশনারের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে সরাসরি হুমকি জানানো। এই ঘটনাটি হাইকমিশনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আজ প্রাতঃকালে জানিয়েছেন যে, হাইকমিশনের কনসুলার কার্যক্রম ও ভিসা প্রদান অবিলম্বে স্থগিত করা হয়েছে। তারা উল্লেখ করেন, নিরাপত্তা ঝুঁকি দূর না হওয়া পর্যন্ত এই পদক্ষেপ বজায় থাকবে এবং ভবিষ্যতে কোনো পরিবর্তন হলে তা দ্রুত জানানো হবে। এই সিদ্ধান্তটি হাইকমিশনের কর্মী ও ভিসা আবেদনকারীদের জন্য অপ্রত্যাশিত অসুবিধা সৃষ্টি করেছে।
মো. তৌহিদ হোসেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, বলেন, হাইকমিশনের অবস্থান কূটনৈতিক এলাকায় নিরাপদ বলে বিবেচিত, তবু চরমপন্থী গোষ্ঠীর প্রবেশের কারণ স্পষ্ট নয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যদি নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথভাবে কাজ করত, তবে এমন ঘটনা ঘটতে পারত না। এই মন্তব্যের মাধ্যমে মন্ত্রণালয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়ন ও শক্তিশালীকরণের ইঙ্গিত দিয়েছে।
বিক্ষোভের পর হাইকমিশনারের পরিবার নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে বলে জানানো হয়েছে। পরিবার সদস্যরা উদ্বেগ প্রকাশ করে, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করা কঠিন। এই পরিস্থিতি কূটনৈতিক কর্মীদের পারিবারিক নিরাপত্তা বিষয়ক উদ্বেগকে আবার উন্মোচিত করেছে, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে প্রায়শই আলোচিত একটি সংবেদনশীল বিষয়।
দিল্লি ও নিউ দিল্লি অঞ্চলে এই ধরনের নিরাপত্তা লঙ্ঘন বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। উভয় দেশের কূটনৈতিক সংলাপের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে নিরাপত্তা বিষয়ক সমন্বয় প্রয়োজন। পূর্বে একই ধরনের ঘটনা ঘটলেও, দ্রুত নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনরায় গঠন করে সেবা পুনরায় চালু করা হয়েছে; তবে বর্তমান পরিস্থিতি আরও জটিল, কারণ এতে ধর্মীয় উগ্রবাদের সঙ্গে কূটনৈতিক নিরাপত্তা সংযুক্ত হয়েছে।
একজন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক উল্লেখ করেন, হাইকমিশনের নিরাপত্তা লঙ্ঘন কেবল ভিসা সেবার উপর নয়, বরং বৃহত্তর আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি বলেন, যদি নিরাপত্তা উদ্বেগ অব্যাহত থাকে, তবে ভিসা প্রক্রিয়ার বিলম্ব ও আবেদনকারীর সংখ্যা হ্রাস পেতে পারে, যা বাণিজ্যিক ও মানবিক সংযোগে বাধা সৃষ্টি করবে। এ ধরনের পরিস্থিতি দুই দেশের কূটনৈতিক মিথস্ক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা হ্রাসের ঝুঁকি বাড়ায়।
পরবর্তী সময়ে নিরাপত্তা মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পর সেবা পুনরায় চালু করা হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে হাইকমিশনের চারপাশের নিরাপত্তা পরিকাঠামো শক্তিশালী করার পরিকল্পনা জানিয়েছে। সুনির্দিষ্ট সময়সীমা এখনও নির্ধারিত হয়নি, তবে উভয় দেশের কূটনৈতিক মন্ত্রণালয় এই বিষয়টি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনা এবং ভিসা সেবার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার জন্য দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত ভিসা আবেদনকারীরা বিকল্প দূতাবাস বা অনলাইন সেবার দিকে ঝুঁকতে পারেন। কূটনৈতিক নিরাপত্তা ও সেবার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা উভয় দেশের পারস্পরিক স্বার্থের জন্য অপরিহার্য, তাই ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা পুনরায় না ঘটার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া প্রত্যাশিত।



