ঢাকার কারওয়ান বাজারে গত বৃহস্পতিবার রাতের আক্রমণে শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের সদর দফতর ধ্বংস হয়ে যায়। অগ্নিকাণ্ড, ভাঙচুর এবং লুটপাটের ফলে দুইটি অফিসই ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয় এবং কর্মীদের নিরাপত্তা উদ্বেগের মুখে পড়ে। এই ঘটনার পর সোমবার দুপুরে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সরাসরি প্রথম আলোয়ের অফিসে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন।
হামলায় অগ্নিকাণ্ডের পাশাপাশি জানালার ভাঙন, দরজার ধ্বংস এবং কাগজপত্রের নষ্ট হওয়া লক্ষ্য করা যায়। লুটপাটের সময় অফিসের সরঞ্জাম, কম্পিউটার এবং অন্যান্য সম্পদ চুরি করা হয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত সিআইডি দল দ্রুত কাজ করে, তবে অগ্নি ও ধ্বংসের পরিমাণ বড় হওয়ায় পুনর্নির্মাণে সময় লাগবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
একই রাতে দেশের অন্যান্য মিডিয়া সংস্থাকেও লক্ষ্য করা যায়। ছায়ানটের অফিসে ভাঙচুর ও অগ্নিকাণ্ডের অভিযোগ জানানো হয়েছে, আর পরদিন সন্ধ্যায় উদীচী সংস্থার দপ্তরে একই রকম আক্রমণ ঘটে। এই ধারাবাহিক আক্রমণকে স্বাধীন ও মুক্ত গণমাধ্যমের ওপর সরাসরি হামলা হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান অফিস পরিদর্শনের সময় উল্লেখ করেন, গণতন্ত্রের পথে অগ্রসর হতে হলে মতবিরোধের মোকাবিলায় যুক্তি ও পাল্টা মতের ব্যবহার করা উচিত, সহিংসতা বা অগ্নিকাণ্ডের মাধ্যমে নয়। তিনি বলেন, “যদি আমরা গণতন্ত্রের সঠিক পথে চলতে চাই, তবে ভিন্নমতকে শান্তিপূর্ণভাবে প্রকাশ করতে হবে, না যে হিংসা ও ধ্বংসের মাধ্যমে দমন করা হবে।”
উল্লেখযোগ্য যে, দেশের নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে এবং এই সময়ে গণমাধ্যমের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। রিজওয়ানা হাসান বলেন, “নির্বাচনের পরিবেশকে উৎসবমুখর ও স্বচ্ছ রাখতে গণমাধ্যমকে স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য ভূমিকা পালন করতে হবে।” তিনি আরও যোগ করেন, “যদি কেউ মিডিয়ার ভূমিকার সঙ্গে একমত না হন, তবে তার মতামত প্রকাশের সঠিক উপায় ব্যবহার করা উচিত, হিংসাত্মক আক্রমণ নয়।”
সরকারের এই ঘটনার প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মিডিয়া সংস্থাগুলোর পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। রিজওয়ানা হাসান জানান, সরকার এই ধরনের আক্রমণকে কঠোরভাবে নিন্দা করে এবং মিডিয়ার স্বাধীনতা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তিনি উল্লেখ করেন, “মিডিয়া যেন স্বাধীন, সঠিক এবং মুক্ত পরিবেশে কাজ করতে পারে, তা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব।”
মিডিয়া সংস্থাগুলো এই হামলাকে ‘গণমাধ্যমের জন্য কালো দিন’ বলে অভিহিত করে ব্যাপক নিন্দা প্রকাশ করেছে। বিভিন্ন সাংবাদিক সংস্থা ও নাগরিক গোষ্ঠী একত্রে প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন, এই ধরনের হিংসা গণতন্ত্রের মৌলিক নীতি ভঙ্গ করে এবং স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়ার জন্য হুমকি স্বরূপ।
এই ঘটনার রাজনৈতিক প্রভাবও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। নির্বাচনের আগে মিডিয়ার ওপর আক্রমণ বাড়লে তথ্যের প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হতে পারে, যা ভোটারদের সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলতে পারে। রিজওয়ানা হাসান উল্লেখ করেন, “স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত নির্বাচনের জন্য মিডিয়ার স্বাধীনতা অপরিহার্য, তাই সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেবে।”
অধিকন্তু, নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে মিডিয়া সংস্থার নিরাপত্তা বাড়াতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এমন আক্রমণ রোধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। সরকার ও নিরাপত্তা দপ্তর একসঙ্গে কাজ করে মিডিয়ার কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চায়।
সারসংক্ষেপে, বৃহস্পতিবার রাতে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারসহ কয়েকটি মিডিয়া দপ্তরে সংঘটিত হামলা দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করেছে। তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসানের মন্তব্য ও সরকারের প্রতিক্রিয়া থেকে স্পষ্ট যে, গণতন্ত্রের সঠিক পথে অগ্রসর হতে হলে হিংসা নয়, যুক্তি ও সমঝোতার মাধ্যমে মতবিরোধ সমাধান করা জরুরি। নির্বাচনের নিকটবর্তী সময়ে মিডিয়ার স্বাধীনতা রক্ষা করা হবে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত করার মূল চাবিকাঠি।



